ভোটের মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে যেসব বক্তব্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র বাকি ১০ দিন। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে নির্বাচনি মাঠে। প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, পোস্টার-মাইক আর জনসংযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে ভোটের পরিবেশ। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন নির্বাচন। সমর্থকদের উপস্থিতি আর স্লোগানে মাঠে মাঠে জমে উঠছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

তবে প্রচারের গরম শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই। বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য আর বাকযুদ্ধে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এক প্রার্থী আরেক প্রার্থীকে ছুড়ে দিচ্ছেন নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ। মঞ্চ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই চলছে কথার লড়াই। এসব তীব্র বক্তব্যে ভোটের মাঠ ক্রমে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।

শনিবার (৩১ জানুয়ারি) নির্বাচনি জনসভায় ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিরাজগঞ্জের এক নির্বাচনি জনসভায় বলেন, ‘আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোনো ষড়যন্ত্র করে কেউ আবার আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। অনেকেই এসে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদের বলবেন—গুপ্ত তোমরা। কারণ, গত ১৬ বছর আমরা তাদের দেখি নাই। তারা ওদের সঙ্গে মিশে ছিল, যারা ৫ তারিখে পালিয়ে গিয়েছে।’

অন্যদিকে, রাজধানীর কেরানীগঞ্জে নির্বাচনি প্রচারে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা বছরের পর বছর আত্মগোপনে ছিলেন, তারা এখন মজলুমদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করছেন, গুপ্ত-সুপ্ত বলছেন। তাদের অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের চেহারা আয়নায় দেখা উচিত।’

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) নির্বাচনি মাঠে নতুনদের স্বাগত জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনের দলীয় প্রার্থী মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি আশা করব, তারা নির্বাচনে আইন মেনে চলবেন এবং কাউকে ব্যক্তিগত আঘাত করে কথা বলবেন না।’

একই আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘মানুষ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে আল্লাহর নাম নেয়। আমার এখানে এমন একজন প্রার্থী আছেন, যিনি প্রথমেই আমার নাম নেন। অতীতে আমি এর চেয়ে অনেক শক্ত ও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে নির্বাচন করেছি। কিন্তু আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করিনি।’

মির্জা আব্বাস আরও বলেন, ‘এখন সারাদিন শুধু আমার নামেই বিষোদ্গার। আমার সম্পর্কে অকথ্য ভাষায় কথা বলা হচ্ছে, আমাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা চলছে। ওরা বোঝেনি—আমি জীবনে বহু নির্বাচন ফেস করে এসেছি। আবারও বলছি, ওরা বাচ্চা ছেলে—আমার সন্তানের মতো।’

জামায়াতে ইসলামী জোট মনোনীত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাসীরুদ্দীন শনিবার (৩১ জানুয়ারি) মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের পাল্টা জবাবে বলেন, ‘গতকাল একজন বলেছেন, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তিনি আল্লাহর নাম না নিয়ে আরেকজনের নাম নেন। এখানে সমাজের একজন সম্মানিত ব্যক্তি রয়েছেন, যাকে সবাই শ্রদ্ধা করেন। তিনি সকালবেলা উঠে আল্লাহর নাম নিয়েই চাঁদাবাজি শুরু করেন, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি শুরু করেন। রাত পর্যন্ত তাদের চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ড চলে।’

এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনীতিক ব্যক্তির বক্তব্য ঘিরে নির্বাচনি মাঠে চলছে উত্তেজনা। থেমে নেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার বেশ কিছু বক্তব্য আলোচনা-সমালোচনায় এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক বক্তব্যে শালীনতা কমে যাচ্ছে এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের মাত্রা বাড়ছে। তারা বলেন, মাঠের উত্তাপ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ হলেও বক্তব্যের ভাষা ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ভোটের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

তাদের ধারণা, পাল্টাপাল্টি এসব বক্তব্য মূলত নিজ নিজ সমর্থকদের উজ্জীবিত করার কৌশল হলেও এতে বিভক্তি ও উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।