আমদানিকৃত উচ্চমানের খেজুরের ওপর চড়া শুল্কের বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের। সরকারি হিসাবে প্রতি কেজি আজওয়া বা মেডজুল খেজুরের আমদানি মূল্য ৪৫৭ টাকা হলেও শুল্ক ও কর পরিশোধের পর কাস্টমস ছাড় করতেই খরচ পড়ছে ৬৪৩ টাকার বেশি। ফলে আমদানিতে শুল্কের হার দাঁড়াচ্ছে ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস অনুবিভাগের তথ্যা অনুযায়ী, বর্তমানে খেজুর আমদানিতে চার ধরনের শুল্ক ও কর দিতে হয়। কাস্টমস হাউজ থেকে আজওয়া, মেডজুল, আম্বার ও মাবরুম এই চার জাতের খেজুর ছাড়াতে প্রতি কেজিতে কর বাবদ ১৮৬ টাকা ১৮ পয়সা কেটে নিচ্ছে সরকার। আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ৬৪৩ টাকার মেডজুল খেজুর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। ভালো মানের আজওয়া খেজুরের দাম এখন কেজিতে ৮৫০-১১০০ টাকা। আর মাবরুম মিলছে এক হাজার থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আজওয়া, মেডজুল, আম্বার/আনবারা ও মাবরুম নামের প্রতি কেজি খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট বা ৪৫৭ টাকা ৫০ পয়সা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে)। এর ওপর ১৫ শতাংশ কাস্টম ডিউটি হিসেবে ৬৮ টাকা ৬২ পয়সা, ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ১৩ টাকা ৭২ পয়সা, সিডি ও আরডির যোগফলের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসেবে ৮০ টাকা ৯৭ পয়সা এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর হিসেবে ২২ টাকা ৮৭ পয়সা দিতে হয়। সব মিলিয়ে এক কেজি উন্নতমানের খেজুর আমদানিতে সরকারকে দিতে হচ্ছে ১৮৬ টাকা ১৮ পয়সা।
অন্যদিকে, মরিয়ম খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য ৩ ডলার ৫০ সেন্ট বা ৪২৭ টাকা। এই খেজুরে শুল্ক ও কর দিতে হচ্ছে ১৭৩ টাকা ৭৮ পয়সা। ফলে কাস্টমস হাউজ পর্যায়ে প্রতি কেজি মরিয়ম খেজুরের খরচ পড়ছে ৬০০ টাকা ৭৮ পয়সা। আর খুচরা বাজারে এই খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায়৷
এত দিন আজওয়া, মেডজুল, আম্বার/আনবারা, মরিয়ম ও মাবরুম প্রতি কেজি খেজুরের আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য ৩ ডলার ৭৫ সেন্ট নির্ধারণ করা ছিল। গত ৮ জানুয়ারি থেকে এসব খেজুরে আগের শুল্কায়ন মূল্য বহাল রেখে শুধু মরিয়মের ক্ষেত্রে ৩ ডলার ৫০ সেন্ট পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য খেজুরেও শুল্কায়নমূল্য পুনর্নির্ধারণ করে কমানো হয়েছে।
এছাড়া আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার খেজুরের আমদানি মূল্য ২৫৬ টাকা ২০ পয়সা। এই খেজুরে বেলায় কেজি প্রতি কর দিতে হয় ১৫০ টাকা ৩৭ পয়সা। সব মিলিয়ে এই খেজুরের ক্ষেত্রে খরচ পড়ছে ৪০৬ টাকা ৫৭ পয়সা।
এনবিআরের তালিকা অনুযায়ী, ইরাক বাদে কার্টনজাত সব খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য ১ ডলার ৯০ সেন্ট। ইরাকি অরিজিন খেজুরের মূল্য ১ ডলার থেকে কমিয়ে ৯০ সেন্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া রিটেইল প্যাকেটজাত খেজুর ২ ডলার ৩০ সেন্ট, বস্তায় শুকনা খেজুর ১ ডলার ৭৫ সেন্ট এবং বস্তায় আসা ভেজা বা গালা খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য মাত্র ৬৫ সেন্ট।
কাস্টমস বিভাগ জানায়, পণ্য চালানের সিঅ্যান্ডএফ বা সিএফআর মূল্যের সঙ্গে ১ শতাংশ বিমা খরচ এবং ১ শতাংশ ল্যান্ডিং চার্জ যোগ করে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য (এভি) নির্ধারণ করা হয়। এরপর এর ওপর চক্রবৃদ্ধি হারে সিডি, আরডি ও ভ্যাট আরোপ হয়।
উদাহরণস্বরূপ, গত ২৪ জানুয়ারি ২ ডলার ৪০ সেন্ট দরে ৭১ লাখ ৭৭ হাজার ৫১৯ টাকা মূল্যের ২৪ হাজার কেজি খেজুর আমদানি করেছে ঢাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আল মক্কা ইন্টারন্যাশনাল ফ্রুটস। সৌদি আরব থেকে আমদানি করা এসব খেজুরের জন্য তাদেরকে চার ধরনের শুল্ক ও কর মিলিয়ে মোট ২৯ লাখ ২১ হাজার ২৫০ টাকা দিতে হয়েছে। এরমধ্যে ভ্যাট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৪২০ টাকা।
২৬ জানুয়ারি ৩ ডলার ৫০ সেন্ট দরে ১ কোটি ৯০ লাখ ৯ হাজার ২৬৭ টাকা মূল্যের ২৪ হাজার ৯৫০ কেজি খেজুর আমদানি করেছে ঢাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মাহমুদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। ইউনাইটেড আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা এসব খেজুরের জন্য তাদেরকে চার ধরনের শুল্ক ও কর মিলিয়ে মোট ৪৪ লাখ ৪০ হাজার ৭১ টাকা দিতে হয়েছে। এরমধ্যে ভ্যাট ১৯ লাখ ৩০ হাজার ৯৪০ টাকা।
শুল্কছাড় ও কর কাঠামো
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে খেজুর আমদানিতে মোট করভার ছিল ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ। পরে অগ্রিম আয়কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করায় তা ৫২ দশমিক ২০ শতাংশে নামে। সবশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর এনবিআর এক প্রজ্ঞাপনে কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করে, যা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই ছাড়ের পর বর্তমানে খেজুর আমদানিতে কার্যকর করের হার ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ।
আমদানির চিত্র
গত ১ জানুয়ারি থেকে ২১ জানুয়ারি বিকাল পর্যন্ত ৬২৩ দশমিক ৫৫ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। এসব খেজুর থেকে এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ৭ কোটি ৮৯ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৬ টাকা। এরমধ্যে কাস্টমস ডিউটি (সিডি) ২ কোটি ৯৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬ টাকা, রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) ৫৭ লাখ ২৫ হাজার ১০৭ টাকা, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ৩ কোটি ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ২শ টাকা ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৯৫ লাখ ৪১ হাজার ৮৪৪ টাকা।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৩ হাজার ৫৫৬ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। এসব খেজুর থেকে এনবিআর রাজস্ব আদায় করেছে ৭১৮ কোটি ৮৩ লাখ ২১ হাজার ৫৭৭ টাকা। এরমধ্যে কাস্টমস ডিউটি (সিডি) ২৮৯ কোটি ৬১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪৭ টাকা। রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ১৬ হাজার ২১৬ টাকা। মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ৩১৩ কোটি ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫৯ টাকা। অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৬৩ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার ৭৫৫ টাকা।
একই বছরের ১ জুলাই থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ২৯ হাজার ৪৭১ মেট্রিক টন। তার আগের বছর ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছিল ১৩ হাজার ৪৬৬ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৮৫১ মেট্রিক টন খেজুর আমদানি হয়েছে। মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮১৫ কোটি ৯৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা।