নিজেকে কখনোই ‘যৌন শিকারি’ হিসেবে মানতে চাননি জেফ্রি এপস্টেইন। ২০১১ সালে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি একজন ‘অপরাধী’ -তবে খুনি আর চোরের পার্থক্যের মতোই তার অপরাধকে দেখা উচিত। অথচ বাস্তবতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ যৌন অপরাধ কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই ধনকুবের।
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা কারাগারে বিচার শুরুর আগেই তার মৃত্যু হয়। সে সময় তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন পাচারের গুরুতর অভিযোগে জামিন বিহীন আটক ছিলেন।
শিক্ষক থেকে কোটিপতি
নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকে অভিজাত ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও স্নাতক শেষ করতে পারেননি। তবে এক শিক্ষার্থীর বাবার মাধ্যমে ওয়াল স্ট্রিটে প্রবেশের সুযোগ পান তিনি।
অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বিনিয়োগ ব্যাংক বেয়ার স্টার্নসে অংশীদার হন এবং ১৯৮২ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ গড়ে তোলেন। একসময় তার প্রতিষ্ঠান এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করত। এর সুবাদে নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে প্রাসাদসম সম্পত্তির মালিক হন তিনি।
ক্ষমতার বলয় ও প্রভাবশালী সখ্যতা
অঢেল সম্পদের পাশাপাশি রাজনৈতিক, শিল্পী ও সেলেব্রিটিদের সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় তার ‘দারুণ মানুষ’ ছিলেন। বিল ক্লিনটন, কেভিন স্পেসি, হার্ভি ওয়াইনস্টাইনসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্কের তথ্য পরে আলোচনায় আসে। যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বিশ্বজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। এই সম্পর্কের জেরে পরবর্তীতে প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে রাজকীয় দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়াতে হয়।
ভয়াবহ অভিযোগ ও বিতর্কিত সমঝোতা
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় প্রথম বড় ধরনের অভিযোগ সামনে আসে- ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, বহু বছর ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতনের একটি নেটওয়ার্ক চালাতেন তিনি।
তবে ২০০৮ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের সঙ্গে এক বিতর্কিত সমঝোতার মাধ্যমে তিনি কঠোর শাস্তি এড়িয়ে যান। সম্ভাব্য যাবজ্জীবনের বদলে মাত্র ১৮ মাসের সাজা পান, তাও বিশেষ ‘ওয়ার্ক রিলিজ’ সুবিধাসহ। এই চুক্তিকে পরে মার্কিন গণমাধ্যম ‘শতাব্দীর সমঝোতা’ বলে আখ্যা দেয়।
দ্বিতীয় দফা গ্রেফতার ও রহস্যজনক মৃত্যু
২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্যারিস থেকে নিউইয়র্কে ফেরার পর আবার গ্রেফতার হন এপস্টেইন। এবার অভিযোগ ছিল আরও বিস্তৃত- আন্তঃরাজ্য পর্যায়ে যৌন পাচার। কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আগেই কারাগারে তার মৃত্যু হয়, যা আজও নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে।
এপস্টেইন ফাইলস ও রাজনৈতিক বিতর্ক
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাস করে। এর ফলে তদন্ত-সংক্রান্ত বহু নথি প্রকাশ পেলেও, সব তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি বলে অভিযোগ বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের। প্রকাশিত নথিগুলোতে উঠে আসে এপস্টেইনের বিলাসী জীবন, প্রভাবশালী যোগাযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা চিত্র।
ম্যাক্সওয়েল মামলা: আইনি অধ্যায়ের শেষ?
এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড পান। আদালতে তিনি স্বীকার করেন, এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
ম্যাক্সওয়েলের সাজা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার বড় অংশ শেষ হলেও, জেফ্রি এপস্টেইন নামটি আজও ক্ষমতা, অপরাধ ও বিচারহীনতার প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।