বিএনপি সরকারে আসলে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী করার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, এ অঞ্চলে মানুষের একটি বড় দাবি আছে, যেটির উদ্যোগ বিএনপি সরকার গ্রহণ করেছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ করে দিতে পারেনি। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি গত ১৫ বছর এই উদ্যোগ নিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এই উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। সেই উদ্যোগটি হচ্ছে বাণিজ্যিক রাজধানী।
তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ আগামী নির্বাচনে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে বেগম খালেদা জিয়ার সেই বাণিজ্যিক রাজধানী করার উদ্যোগ যত দ্রুত সম্ভব বিএনপি বাস্তবায়ন করবে।
জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে ফের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘বিগত ১৫ বছর যেভাবে আপনাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেরকম একটি ষড়যন্ত্র ফের শুরু হয়েছে। আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, সেই ষড়যন্ত্রের প্রতি সজাগ থাকবেন, সতর্ক থাকবেন, যাতে আপনাদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে। আপনাদের ভোটের অধিকার, আপনাদের কথা বলার অধিকার, আপনাদের বেঁচে থাকার অধিকার যেন আর কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে।’
কখন যাবেন ভোট দিতে? নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিন, এবার কিন্তু ফজরে গেলে হবে না, এবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার জন্য উঠতে হবে। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে যার যে ভোটকেন্দ্র, সেই ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। তারপর লাইন দিয়ে ভোটের জন্য দাঁড়িয়ে যাবেন। পারবেন? ইনশাল্লাহ।’
‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যাতে কেউ আপনাদের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিতে না পারে, মা-বোনদের কাছেও আমার অনুরোধ, সেদিকে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন, সজাগ থাকবেন।’
বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশকে নিয়ে আমরা যতই পরিকল্পনা করি না কেন, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দুটো বিষয়ে নজর দিতে হবে। অতীতে বিএনপি যতবার সরকার পরিচালনা করেছে, বিএনপি প্রমাণ করে দেখিয়েছে, একমাত্র বিএনপিই এই দুটো কাজ সফলভাবে করতে পারে। কি সেই বিষয় দুটো? এক. মানুষের নিরাপত্তা, যাতে করে মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি সব করতে পারে। বিগত সময় যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনা করেছিলেন, তখন আপনারা দেখেছিলেন, যে-ই হোক না কেন, এমনকি আমাদের দলের অনেক লোক, যারা কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত হলে তাদেরও কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি।’
‘আজ এ দেশের জনগণ, এ দেশের মানুষ যদি আমাদের পাশে থাকে, আগামীদিনেও আমরা একভাবে কঠোর হস্তে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করব, যাতে দেশের সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, যাতে করে নির্বিঘ্নে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।’
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় আছে, আমরা যতই পরিকল্পনা করি, সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না। বিএনপি অতীতে সেই বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে প্রমাণ করেছে যে একমাত্র বিএনপির পক্ষেই সম্ভব। সেই বিষয় হচ্ছে দুর্নীতি। যে কোনোমূল্যে আগামীর বিএনপি সরকার দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে। এই দুটি হচ্ছে আমাদের কমিটমেন্ট বাংলাদেশের জনগণের কাছে।’
পলোগ্রাউন্ড ময়দানে বিএনপির নির্বাচনি সমাবেশ।
‘কারণ বিএনপি সরকার অতীতেও এটা প্রমাণ করেছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যারা দেশে ক্ষমতায় ছিল, তারা দেশকে দুর্নীতিতে নিচের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ২০০১ সালে যখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আপনাদের সমর্থনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান, তিনি তখন দেশকে ধীরে ধীরে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের করে নিয়ে আসেন।’
অপরাধীর কোনো দল নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য সমান। অপরাধীর পরিচয় কোনো দল দিয়ে নয়। অপরাধী যে-ই হোক, আইনের দৃষ্টিতে সে অপরাধী। সুতরাং অপরাধী যে-ই হোক, দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি যে-ই করুক, যারা-ই করুক, তাদের বিরুদ্ধেও দেশের আইন একইভাবে প্রযোজ্য হবে। পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই, আমরা যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা দুর্নীতির মাধ্যমে সেটাকে বাধাগ্রস্ত করেন, তাদের কোনো ছাড় আমরা দেব না ইনশাল্লাহ।’
সকল মানুষকে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, ‘এই সেই চট্টগ্রাম, যেখানে সমতল এবং পাহাড়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। আমরা চাই সমতল এবং পাহাড়ের মানুষ, আন্দোলনের সময় আমরা দেখিনি কে সমতলের মানুষ আর কে পাহাড়ের মানুষ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা দেখিনি, কে সমতলের মানুষ আর কে পাহাড়ের মানুষ। আমরা চাই, সকলকে নিয়ে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য, সে পাহাড়ের মানুষ হোক, সে সমতলের মানুষ হোক, সে ইসলাম ধর্মের মানুষ হোক, সে অন্য ধর্মের মানুষ হোক। আমরা সকলকে নিয়ে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই।’
‘সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ যদি গড়ে তুলতে হয়, এখানে যে লাখো মানুষ উপস্থিত আছেন, আপনাদের মাধ্যমে আপনাদের এলাকার লাখো-কোটি মানুষের কাছে আমি আবেদন রাখাব, গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করেন, মানুষের বাকস্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করেন, সকলকে আমি আহ্বান জানাব, ধানের শীষের ওপর আস্থা রাখুন, বিএনপির ওপর আস্থা রাখুন। বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে হাত দেবে ইনশাল্লাহ অতীতের মতো।’
তিনি বলেন, ‘আজ সময় এসেছে পরির্তনের। এই পরিবর্তনকে যদি সত্যিকার অর্থে অর্থবহ করতে হয়, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের সবাইকে আজ ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের বাংলাদেশকে যদি গড়ে তুলতে হয়, তাহলে গণতন্ত্রের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যে কারণে ওয়াসিম আকরামরা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, তাদের জীবন আর ত্যাগের যদি মূল্য দিতে হয়, তাহলে মানুষের যে প্রত্যাশা সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সেজন্যই বলছি, ধানের শীষের ওপর আস্থা রাখুন, বিএনপির ওপর আস্থা রাখুন।’
প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে সমালোচনায় অনাগ্রহ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দল যারাই হোক না কেন, তাদের সম্পর্কে অনেক কথাই বলতে পারি, দোষত্রুটি তুলে ধরতে পারি; তাতে কি জনগণের কোনো উপকার হবে? সমালোচনায় দেশের মানুষের পেট ভরবে না। বিএনপিই একমাত্র দল যারা ক্ষমতায় থেকে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি দেশে ফিরেই বলেছিলাম, উই হ্যাভ এ প্ল্যান। অর্থাৎ, আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষেকে নিয়ে। কোটি কোটি যুবসমাজ কর্মসংস্থান চায়। আপনাদের রায়ে ১২ তারিখের ভোটে সরকার গঠনে সক্ষম হলে প্রাইমারিসহ শিক্ষার সব স্তরে পরিবর্তন আনতে চাই। যাতে তরুণ সমাজ শুধু সার্টিফিকেট পাবে না, জীবন শেষে কর্মসংস্থান যাতে সহজেই করে নিতে পারে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘আমরা বলতে পারি অমুক জায়গায় এত বেডের হাসপাতাল করব। আমরা তা বলতে চাই না। আমরা চাই গ্রামের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে। এ জন্য আমরা এক লাখ হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগ দেব। যাতে ঘরে বসে সেবা পাওয়া যায়।’
খাল কাটা কর্মসূচির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জলাবদ্ধতা বড় সমস্যা। সারা বাংলাদেশে খাল-বিল-নদী-নালা বন্ধ হয়ে গেছে। সমগ্র বাংলাদেশে আমরা খালকাটা কর্মসূচি চালু করতে চাই। ইনশাল্লাহ সকলে কাঁধে কোদাল নিয়ে খাল কাটা শুরু করব।’
তিনি বলেন, ‘১২ তারিখের নির্বাচনে আপনাদের রায়ে নির্বাচিত হলে আমরা ইপিজেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করব। যাতে লাখ লাখ তরুণ চাকরি পায়।’
‘কথা একটাই, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ – এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তারেক রহমান।
এরপর তারেক রহমান চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার ২৩টি সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ’র সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা এবং ধানের শীষের মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীরা বক্তব্য দেন।
এর আগে, দুপুর ১২ টা ২৫ মিনিটের দিকে তারেক রহমান সমাবেশ মঞ্চে পৌঁছান। এ সময় উপস্থিত লাখো নেতাকর্মী তুমুল করতালি ও স্লোগান দিয়ে তাকে বরণ করে নেন। সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে হোটেল রেডিসনে তরুণদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। এসব কর্মসূচিতে যোগ দিতে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাতে চট্টগ্রামে পৌঁছান তারেক রহমান।
পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশ শেষ করে তিনি সরাসরি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। পথে ফেনী, কুমিল্লাা ও নারায়ণগঞ্জে আরও মোট ৫টি সমাবেশে যোগ দেবেন।
তারেক রহমান সর্বশেষ চট্টগ্রামে এসেছিলেন ২০০৫ সালে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনি প্রচারণায় এসে তিনি নগরীর লালদিঘী ময়দানে জনসভা করেছিলেন। এরপর এক-এগারো পরবর্তী জরুরি অবস্থায় তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন এবং একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। দেড় দশক পর দেশে ফিরে তিনি পিতা জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বরণের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম শহরে আসেন।