তবে এই পথচলাটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। ২০১৪ সালে বাবার আকস্মিক প্রয়াণে মিথিলার জীবনে নেমে এসেছিল শোকের কালো মেঘ, ডুবে গিয়েছিলেন গভীর অবসাদে। সেই কঠিন সময়ে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্বামী সাবির আহমেদ। স্বামীর নিরন্তর অনুপ্রেরণায় বিষণ্ণতাকে বৃষ্টির মতো ঝরিয়ে দিয়ে মিথিলা শুরু করলেন সৃষ্টির এক নতুন পথচলা।

মিথিলা মনে মনে ভাবলেন, ‘আমাদের সোনার বাংলায় যে ডেনিম বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়, তাকে কেন আমরা নতুন আঙ্গিকে নিজের দেশে সাজাব না?’ সেই অদম্য ভাবনা থেকেই ২০১৯ সালে গাজীপুরে জন্ম নিল ‘বিদোরা’। যেখানে রি-সাইকেল ডেনিম, ফেব্রিক আর চামড়ার অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি হতে শুরু করল ব্যাগ। নিপুণ কারিগরি আর আধুনিক ডিজাইনের কাছে সাধারণ ডেনিম সেখানে হয়ে উঠল এক টুকরো আভিজাত্য।

আজ ‘বিদোরা’ মানেই ফ্যাশন সচেতন তরুণী ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের কাঁধে এক শৈল্পিক নির্ভরতা। হ্যান্ডব্যাগ থেকে শুরু করে ব্যাকপ্যাক কিংবা বড় ট্রাভেল ব্যাগ—প্রতিটি সেলাইয়ের ভাঁজে মিশে আছে ২৫ জন দক্ষ কর্মী আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ১০০ জন নারীর অক্লান্ত পরিশ্রম।
মিথিলার এই ডেনিম কাব্যের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর অনন্যতা। তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে খেয়াল রাখেন যেন কোনো ডিজাইনেরই পুনরাবৃত্তি না হয়; অর্থাৎ একজন কাস্টমার যে ব্যাগটি কিনছেন, সেটি শুধুই তার জন্য তৈরি, অন্য কারও কাছে তেমনটি মিলবে না। এই স্বকীয়তাই বিদোরাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তুলেছে।

শখের বসে শুরু করা সেই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ প্রায় ৭০-৮০ লাখ টাকার এক বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ডেনিমের ব্যাগ ছাড়িয়ে বিদোরায় এখন পাওয়া যাচ্ছে ডেনিম প্যাঁচওয়ার্কের চুড়ি, টেবিল রানার, ওড়না কিংবা শালের মতো বৈচিত্র্যময় পণ্য। যদিও কাঁচামাল ও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো এখনো চ্যালেঞ্জিং, তবুও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ নিয়ে বিদোরার পণ্য এখন পাড়ি জমাচ্ছে কানাডা, ইউএসএ, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। মিথিলার স্বপ্ন একটাই,বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে মানুষ বাংলাদেশকে চিনবে ‘বিদোরা’র মাধ্যমে।

হ্যান্ডব্যাগ বা ট্রাভেল ব্যাগ ছাড়িয়ে এখন ডেনিমের চুড়ি, প্যাঁচওয়ার্কের শাল কিংবা টেবিল রানারেও মিথিলা ছড়িয়ে দিচ্ছেন তার সৃজনশীলতার ছোঁয়া। নীল ডেনিমের এই জাদুকরী যাত্রা যেন এক মুক্তিযোদ্ধার কন্যার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, যার শেষটা হবে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পতাকা আরও একবার গর্বের সাথে তুলে ধরার মাধ্যমে।