যৌন হয়রানির অভিযোগে তোলপাড় ক্রিকেটাঙ্গন

গেল কয়েক বছর দেশের ক্রিকেটের পারফরম্যান্স টালমাটাল। পুরুষ দল থেকে নারী দল- দুই পক্ষেরই অবস্থান এখন নাজুক। মাঠে যতটা শান্ত পরিবেশ, মাঠের বাইরে ততটাই অশান্ত অবস্থা। ফলাফলের গ্রাফ নেমে এসেছে তলানিতে, আর মাঠের বাইরের বিতর্ক যেন প্রতিদিনই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এবার বিতর্কের আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিলেন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম। 
দিন কয়েক আগেই নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ার, জাতীয় দলে অবহেলা, বঞ্চনার শিকার ও সিন্ডিকেট নিয়ে এক সাক্ষাৎকার দেন জাহানারা আলম। সেই সাক্ষাৎকারে নারী দলের সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম, বিসিবির নারী বিভাগের সাবেক ইনচার্জ প্রয়াত তৌহিদুর রহমান ও অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া থাকা এ পেসার। তারই ধারাবাহিকতায় এবার মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করেছেন জাহানারা। সাবেক নির্বাচক ও টিম ম্যানেজার নাকি তার সঙ্গে যৌন হয়রানি করেছেন। এক ক্রীড়া সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনটিই জানান তিনি।

বাংলাদেশি পেসার বলেছেন, ‘উনি (মঞ্জুরুল ইসলাম) একদিন আমার কাছে এলেন, আমার কাঁধে হাত রেখে বলতেছেন, তর পিরিয়ডের কত দিন চলতেছে। পিরিয়ড শেষ হলে বলিস, আমার দিকটাও তো দেখতে হবে। পিরিয়ড শেষ হলে, যখন ডাকব চলে আসিস।’

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সাধারণত দুই দলের খেলোয়াড় কোচরা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলান। তবে মঞ্জু নাকি ম্যাচ শেষে তার সঙ্গে হাত না মিলিয়ে জড়িয়ে ধরতেন বলে জানান জাহানারা। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচে, যখন আমরা লাইনে হ্যান্ডশেক করি, তখন তিনি (মঞ্জুরুল) হ্যান্ডশেক না করে জড়িয়ে ধরতেন।’ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) অনেকবার এ বিষয়ে অভিযোগ দিলেও কোনো বিচার পাননি বলে জানান জাহানারা।

তবে এসব অভিযোগ ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন মঞ্জুরুল। জাহানারার অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় বার্তা সংস্থা এএফপিকে বর্তমানে চীনে অবস্থানরত মঞ্জুরুল বলেন, ‘সব মিথ্যা। আপনি দলের অন্য মেয়েদের জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন।’

এমন গুরুতর অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটার থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে এটি। 

জাহানারার এসব অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানায়, ‘জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের এক সাবেক সদস্যের করা অভিযোগে দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির অসদাচরণের উল্লেখ রয়েছে।’ বিসিবি জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দেবে।

এ বিষয়ে জাহানারার পাশে থাকার আশ্বাস জানিয়েছে ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। ‘কোনো আশ্বাস বা দীর্ঘসূত্রতা আমরা এখানে দেখতে চাই না’ উল্লেখ করে যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে কেউ দায়ী থাকলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে তারা। এ ছাড়া নারী ক্রিকেটের জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে এ ধরনের ঘটনা আরো গভীরভাবে খতিয়ে দেখারও দাবিও করেছে কোয়াব।

জাহানারার এমন অভিযোগের প্রভাবমুক্ত তদন্ত দাবি করেছেন সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মাশরাফি। ক্রীড়াঙ্গনের স্বার্থে জাহানারা প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান ম্যাশ।

তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট ও গোটা ক্রীড়াঙ্গনের স্বার্থে জাহানারা আলমের প্রতিটি অভিযোগ বিসিবি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে আশা করি।’ প্রভাবমুক্ত তদন্তের দাবি করে মাশরাফি আরো লেখেন, ‘আশা করি, বিসিবির তদন্ত কমিটি পুরোপুরি প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করবে এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যেন এসবের পুনরাবৃত্তি আর কখনো না হয়। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নিরাপদ হোক সবার জন্য।’

মুখ খোলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালও। টাইগ্রেস পেসারের ঘটনায় বিসিবির বাইরে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং আরো এমন ভুক্তভোগীদের সাহস নিয়ে সামনে আসার বার্তা দিয়েছেন তিনি। এক ফেসবুক পোস্টে তামিম লিখেছেন, জাহানারা আলম যে অভিযোগগুলো তুলেছেন, সবগুলোই গুরুতর এবং সেসব সত্যি হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। শুধু একজন জাতীয় ক্রিকেটার বা সাবেক অধিনায়ক বলেই নয়, যে কোনো পর্যায়ের ক্রিকেটার হোক বা যে কোনো খেলার ক্রীড়াবিদ কিংবা যে কোনো নারী, কারো প্রতিই এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিসিবি সংশ্লিষ্টদের বাইরে রেখে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তামিম। তিনি বলেন, বিসিবি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বটে। তবে আমি মনে করি, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কিংবা সরকারি পর্যায়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত, যেখানে বিসিবি সংশ্লিষ্ট কেউ থাকবেন না, যাতে বিন্দুমাত্র পক্ষপাতের সুযোগ না থাকে। যত দ্রুত সম্ভব এই কমিটি গঠন করা উচিত ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপারটিকে দেখা উচিত। দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে দোষী যে-ই হোক, যার যতটুকু দায় থাকুক, উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে জাহানারা আলম যৌন হয়রানির বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নিলে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।

তামি আরও বলেন, এ ধরনের কাজ করে কেউ যেন পার পেয়ে না যান, তা নিশ্চিত করবে সরকার।’

বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

জাহানারার সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে জানিয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের দপ্তর থেকে ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি যদি আইনি ব্যবস্থা নিতে চান, এটা যেহেতু ফৌজদারি অপরাধও, এটা সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যারা জড়িত, তারা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পান, সেটা আমরা নিশ্চিত করব।’

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানির প্রসঙ্গ টেনে উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ধরনের কথা আজকে প্রথম এসেছে, তা নয়, অন্যান্য খেলা থেকেও অনেক সময় (অভিযোগ) আসে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, এ ধরনের কাজ করে কেউ যেন পার পেয়ে না যায়।’