চট্টগ্রাম বন অঞ্চলে পোস্টিং বাণিজ্যে তোলপাড়

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় শুরু হয় ব্যাপক রদবদল। বিভিন্ন অধিদপ্তরে পদ-পদবী পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠদের সরিয়ে এনে বসানো হয় দীর্ঘদিনের সুবিধাবঞ্চিত কর্মকর্তাদের। কিন্তু এই সুযোগে কিছু মুখোশধারীও সুবিধাজনক পদে জায়গা করে নেয় — যাদের মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিম।

চাকরিজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত এই কর্মকর্তা, দায়িত্ব গ্রহণের পরই কথিতভাবে শুরু করেন নতুন দুর্নীতির অধ্যায়। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি একযোগে ৭৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। এতে বিপুল পরিমান টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে এলে শুরু হয় তদন্ত অভিযান, যাতে উঠে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বর্তমানে মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে দু’টি পৃথক তদন্ত চলমান রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক তদন্ত করে পান দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ।

অভিযোগ রয়েছে, মোল্যা রেজাউল করিম তার দুর্নীতির কর্মকাণ্ডে  মো. সাদেকুর রহমান, ডেপুটি রেঞ্জার (রেঞ্জ কর্মকর্তা, ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ) ও আব্দুল হামিদ, ডেপুটি রেঞ্জার (রেঞ্জ কর্মকর্তা, মানিকছড়ি রেঞ্জ, খাগড়ছড়ি বন বিভাগ) জড়িত রয়েছে। এছাড়া তাদের সঙ্গে ডেপুটি রেঞ্জার মামুন মিয়া, আনিচুর রহমান, রাশেদুজ্জামান, ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল মালেক ও বাচ্চ মিয়া নানা অনিয়মে জড়িত রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে — মোল্যা ও তার ঘনিষ্ঠরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তদন্ত প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে,  ফিল্ড পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে পোস্টিংয়ের নামে লাখ লাখ টাকা আদায় করে পছন্দের লোকদের বসানো হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পদে। বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে ঘুষ না দেওয়া কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। এতে মাঠপর্যায়ে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ ও হতাশা।

সবশেষ আলোচিত ঘটনাটি হলো, ডেপুটি রেঞ্জার মো. সাদেকুর রহমানের মাধ্যমে ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল মালেককে লামা বন বিভাগের মাতামুহুরী রেঞ্জের পাশাপাশি লামা সদর রেঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা। অথচ দুটি রেঞ্জের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। যেখানে ২/৪ অন সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায়, সেখানে একযোগে দুটি রেঞ্জের দায়িত্ব দেওয়া—প্রশাসনিকভাবে অনৈতিক ও অবাস্তব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদায়ন মূলত মোল্যা রেজাউল করিমের ঘুষ বাণিজ্যের অংশ হিসেবে করা হয়েছে।

ফিল্ড পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, “বন রক্ষার চেয়ে এখন প্রশাসনিক বাণিজ্যই বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তদন্ত সংস্থাগুলো যদি এখনই পদক্ষেপ না নেয়, তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন বিভাগ আরও গভীর দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে— এমন আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।