পোশাক শিল্পে মানসিক সহিংসতার শিকার ৫৫% নারী শ্রমিক

পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এমন চিত্র উঠে এসেছে আইসিডিডিআর, বি পরিচালিত প্রথম কোহর্ট গবেষণায়।

সোমবার রাজধানীর মহাখালীর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহায়তায় ‘অ্যাডসার্চ বাই আইসিডিডিআর, বি’ ২৪ মাসব্যাপী এই গবেষণা সম্পন্ন করে। গবেষণায় কড়াইল ও মিরপুর বস্তি এবং গাজীপুরের টঙ্গী বস্তির ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী ৭৭৮ জন বিবাহিত নারী পোশাক শ্রমিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গবেষণার শুরুতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার হার ছিল ৪৮ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে। তবুও সহিংসতার শিকার নারীরা আনুষ্ঠানিক সাহায্য নিতে প্রায় কেউই এগিয়ে আসেন না।

কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনায়ও মাত্র এক-পঞ্চমাংশ নারী কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন এবং দুই বছর পরও এ চিত্র অপরিবর্তিত রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নারী শ্রমিকের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং তাদের অনেকেই কিশোরী অবস্থায় প্রথমবার গর্ভধারণ করেছেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন এবং এক-চতুর্থাংশ গর্ভপাত বা মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নারী শ্রমিকের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং তাদের অনেকেই কিশোরী অবস্থায় প্রথমবার গর্ভধারণ করেছেন। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হয়েছেন এবং এক-চতুর্থাংশ গর্ভপাত বা মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

পরিবার পরিকল্পনায় সচেতনতার হারেও পরিবর্তন এসেছে। গবেষণার শুরুতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতেন ৪৯ শতাংশ নারী, যা দুই বছর শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি সম্পর্কে সচেতনতা ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে পরিবার পরিকল্পনায় লিঙ্গ সমতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে।

সহিংসতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গত ১২ মাসে এসব নারীর প্রতি স্বামীর সহিংসতার হার অনেক বেশি পাওয়া গেছে এবং যৌন সহিংসতা ছাড়া অন্য সব ধরণের সহিংসতা দুই বছরে বেড়েছে। শুরুতে ৩৫ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিকভাবে (পরিবার বা বন্ধুদের কাছে) সাহায্য চাইতেন, কিন্তু দুই বছর শেষে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২১ শতাংশে।

গবেষণায় আরও জানা যায়, গার্মেন্ট কারখানায় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সীমিত। কেবল ২২ শতাংশ কারখানায় স্যানিটারি প্যাড পাওয়া যায় এবং মাত্র ১৪ শতাংশ কারখানায় পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সরবরাহ করা হয়।

কিশোরী গর্ভধারণের নিয়ামক

গবেষণার ফলাফলের দেখা যায়, শিক্ষা ও দেরিতে বিয়ে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমায়। সন্তান ধারণের আগেই গর্ভনিরোধক ব্যবহার শুরু করলে ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কমে যায়।

প্রথম গর্ভধারণের আগে গার্মেন্ট খাতে কাজ শুরু করলেও ঝুঁকি কম থাকে। অন্যদিকে স্বামীর সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকলে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়।

নারীর ক্ষমতায়ন সহিংসতার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকলে মানসিক ও যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা মেলে, মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকলে যৌন সহিংসতা কমে এবং চলাচলে স্বাধীনতা থাকলে শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকি কমে যায়।

 

আলোচকদের মতামত

সেমিনারে এক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সেকেন্দার আলী মোল্লা, পপুলেশন কাউন্সিল বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক উবাইদুর রব, বিকেএমইএ-এর যুগ্ম সচিব ফারজানা শারমিন এবং মেরী স্টোপস বাংলাদেশের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও স্বতন্ত্র গবেষক ইয়াসমিন এইচ আহমেদ।

ইয়াসমিন এইচ আহমেদ বলেন, “গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে তারা আমাদের সমাজের অংশ। তারা বাইরের কেউ নয়। আমাদের সমাজে যে ধরণের মনোভাব রয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও একই চিন্তাধারা কাজ করে। দীর্ঘ প্র‍্যাকটিসের কারণে অনেক সময় তারাও এটাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। এটা পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লাগবে।

বিকেএমইএ-এর যুগ্ম সচিব ফারজানা শারমিন বলেন, “গার্মেন্টসে কাজ করা নারীদের একটা অংশ লেখতে ও পড়তে পারে না। নারীদের পদোন্নতি নিয়ে নানা কথা বলা হয়। তাদের পদোন্নতি হচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। হচ্ছে, কিন্তু সেই সুযোগটি কম কারণ শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। শুধু কর্ম দক্ষতা সমাজ দেবে বিষয়টি এমন না। নিজে থেকেও আদায় করে নিতে হবে।”

গবেষণা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আরবান এলাকায় গার্মেন্টস স্থাপনের সুযোগ নেই। যে কারণে এখানের স্যাম্পল কম, পাশাপাশি এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড কারখানায় ১৮ বছরের কম কর্মীদের কাজের সুযোগ নেই। কোনো কর্মী পাওয়া গেলে তা ব্যান করা হবে।”

গবেষণার প্রধান গবেষক ও প্যানেল আলোচনা পরিচালনা করেন আইসিডিডিআর, বি-র ইমিরেটাস সায়েন্টিস্ট রুচিরা তাবাসসুম নভেদ।