যৌনরোগ সিফিলিসে কাঁপছে জার্মানি
সিফিলিসে আক্রান্ত এলজিবিটিকিউ+ রোগীদের প্রায় অর্ধেকই একই সঙ্গে এইচআইভি-পজিটিভ। এ ছাড়া হেপাটাইটিস সি-এর মতো অন্যান্য যৌনবাহিত রোগও তাদের মধ্যে প্রায়শই দেখা যায়।
জার্মানিতে যৌনবাহিত রোগ সিফিলিসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। রবার্ট কখ ইনস্টিটিউটের (আরকেআই) সবশেষ প্রতিবেদন অনুসারে রাশিয়া টুডে রবিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালে দেশটিতে মোট ৯ হাজার ৫১৯টি সিফিলিস কেস নথিভুক্ত হয়েছে।
এই শতকের শুরুতে মানে ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৬৯৭টি। গত দুই দশকে সংক্রমণ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিফিলিসের সংক্রমণ ক্রমশই বাড়ছে এবং এটি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রেপোনেমা প্যালিডাম নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ ছড়ায় এবং এটি একটি গুরুতর যৌনবাহিত সংক্রমণ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা মারাত্মক হতে পারে।
আরকেআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালে জার্মানিতে সিফিলিস সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৬৪। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রেখেছে এ রোগ।সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সংক্রমণের হার আরও ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি পুরুষদের মধ্যে, বিশেষ করে যারা পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত (এমএসএম) অথবা রূপান্তরিত নারীর (ট্রান্সজেন্ডার নারী) সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন।
২০২৪ সালের কেসগুলোর মধ্যে ৯২ দশমিক ৪ শতাংশই পুরুষ। নারীদের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
অধিকাংশ সংক্রমিত রোগীর গড় বয়স প্রায় ৪১ বছর। এর মধ্যে পুনরায় সংক্রমণের প্রবণতাও লক্ষণীয়, যা বিশেষজ্ঞদের মতে সিফিলিস মোকাবিলায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আরকেআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সিফিলিসে আক্রান্ত এলজিবিটিকিউ+ রোগীদের প্রায় অর্ধেকই একই সঙ্গে এইচআইভি-পজিটিভ। এ ছাড়া হেপাটাইটিস সি-এর মতো অন্যান্য যৌনবাহিত রোগও তাদের মধ্যে প্রায়শই দেখা যায়। এই সহসংক্রমণগুলো রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কেন বাড়ছে সংক্রমণ
১৯৯০ এর দশকের শেষ দিক থেকে সমকামী পুরুষদের মধ্যে সিফিলিস সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। ১৯৯৭ সালে প্রথমবার হ্যামবার্গ শহরে এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ২০০৩ সালের মধ্যে পুরুষদের মধ্যে সংক্রমণের হার নারীদের তুলনায় দশ গুণ বেশি ছিল।
বর্তমানে সংক্রমণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (৭৫ শতাংশ) কেসই এলজিবিটিকিউ+ কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন ডেটিং অ্যাপসের ব্যাপক ব্যবহার যৌন সঙ্গীর সংখ্যা বাড়িয়েছে। এর মধ্যে অনেক অচেনা ও বেনামী যোগাযোগও রয়েছে, যা সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম কারণ।
কোন কোন এলাকায় বেশি সংক্রমণ
আরকেআই জানিয়েছে, সিফিলিস সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি বড় শহরগুলোতে—বার্লিন, হামবুর্গ, কোলন, ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং মিউনিখে। এসব শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব, বৈচিত্র্যময় সামাজিক জীবন এবং অনলাইন ডেটিংয়ের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সুরক্ষিত আচরণে উৎসাহিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরকেআই বলছে, সিফিলিসের এই রেকর্ড বৃদ্ধি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সংকেত। তাই জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।