অধ্যাপিকা নাহিদ বানু বাংলাদেশের শিক্ষা, গবেষণা এবং লেখালেখির জগতে এক অনন্য নাম। ইতিহাসের শিক্ষক হয়েও তিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুলেছেন তাঁর গবেষণা, প্রবন্ধ এবং ভ্রমণভিত্তিক লেখার মাধ্যমে। তাঁর জীবন, কর্ম ও চিন্তা আমাদেরকে অতীতের আলোকে বর্তমানকে বোঝার সুযোগ করে দেয়।
নাহিদ বানুর জন্ম চট্টগ্রামের একটি বিশিষ্ট পরিবারে। পিতা মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদ উল ইসলাম এবং মাতা ফিকরিয়া বানু। স্বামী আমজাদুল ফেরদৌস চৌধুরী একজন নিবেদিতপ্রাণ সহচর, যিনি সবসময় তাঁর গবেষণা ও লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যার জননী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে তিনি বি. এ অনার্স ও এম. এ ডিগ্রি অর্জন করেন। অনার্স পর্যায়ে তিনি বৃত্তি লাভ করেন, যা তাঁর মেধা ও অধ্যবসায়ের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। শিক্ষা জীবনের এই সাফল্য তাঁকে ভবিষ্যতের এক প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে প্রস্তুত করে।
নাহিদ বানু শিক্ষিকা হিসেবে চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা মহিলা মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি শিক্ষকতা করে আসছেন এবং বর্তমানে তিনি একজন সহকারী অধ্যাপক। তাঁর পঠনপাঠন, পাঠদানের দক্ষতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁকে প্রিয় করে তুলেছে।
তাঁর লেখালেখির ক্ষেত্রেও রয়েছে উজ্জ্বল উপস্থিতি। নানা পত্রিকায় তিনি ইতিহাসভিত্তিক প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দুটি লেখা হচ্ছে— “সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফর” বিষয়ক প্রবন্ধ যা বাংলাবাজার পত্রিকায় ১৫ জুলাই ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং “চীনের দিনপঞ্জি” শীর্ষক ভ্রমণকাহিনী, যা প্রথম আলো পত্রিকার ‘ছুটির দিনে’ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সংখ্যায় ছাপা হয়। এই লেখাগুলোতে যেমন রয়েছে তথ্যনিষ্ঠতা, তেমনি রয়েছে তাঁর নিজস্ব ভাষাশৈলী ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি।
বিশ্বদর্শন ও অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, বার্মা, ভারত, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব, দুবাই এবং কুয়েত— এই দেশগুলোর সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস তাঁর গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “মোগল প্রাসাদের আলোর পাখিরা” ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বইটি তিনি লেখেন মোগল যুগের নারীদের অন্তঃপুরজীবন, তাঁদের প্রতিভা, বুদ্ধিমত্তা, দানশীলতা, কবিত্ব শক্তি এবং প্রাসাদের অভ্যন্তরীণ জগৎকে কেন্দ্র করে। গ্রন্থের ভূমিকাতেই তিনি বলেন— “মোগল যুগ আমার মতে এদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ… রাজপ্রাসাদের নারীরাও অনন্যা। মোগল অন্তঃপুরে জন্মগ্রহণ করেছেন অসাধারণ আসামান্যরা… তাঁদের জীবনের প্রতি আমার আকর্ষণ ও অনুসন্ধিৎসা আমাকে বারবার প্ররোচিত করেছে নানা খবর সংগ্রহের জন্য।”
এই বক্তব্যে আমরা পাই এক ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু নারীর হৃদয়ের উন্মুক্ত দরজা, যেখানে শুধু তথ্য নয়, আছে ভালোবাসা, কৌতূহল ও একনিষ্ঠতা।
নাহিদ বানুর এই বইয়ের পেছনে যাঁরা প্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও তাঁর উচ্চ মানসিকতার পরিচায়ক। স্বামী আমজাদুল ফেরদৌস চৌধুরীর অব্যাহত উৎসাহ এবং প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. প্রকৃতি চক্রবর্তীর প্রেরণার কথা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর এই সাহিত্যিক ও গবেষণা কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— তিনি ইতিহাসকে কেবল তথ্যমূলকভাবে উপস্থাপন করেন না, বরং তা বিশ্লেষণ করে পাঠকের সামনে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেন। তাঁর লেখায় ইতিহাস জীবন্ত হয়ে ওঠে, যেখানে রাজা-রানীরা কেবল নাম নয়, বরং মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হন।
অধ্যাপিকা নাহিদ বানু নিজেই স্বীকার করেন, তাঁর বইয়ে পাণ্ডিত্য নেই, আছে কৌতূহল। কিন্তু এই কৌতূহলই তাঁকে পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ইতিহাসপ্রেমী ও সাধারণ পাঠকের কাছে তাঁর লেখা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বলেই “মোগল প্রাসাদের আলোর পাখিরা” একটি সমাদৃত বই হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আজকের বাংলাদেশে নারী গবেষক, লেখক ও শিক্ষকদের যে অসামান্য উত্থান ঘটেছে, অধ্যাপিকা নাহিদ বানু তার অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর জীবন-দর্শন, শিক্ষা ও সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক : সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র।