লবনকাণ্ড থেকে মরিচের ঝাল : দরকার ভোক্তা সচেতনতা 

মোঃ খালেদ সাইফুল্লাহ

আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয় ২০১৯ সালে নভেম্বর মাসে ঘটে যাওয়া লবন নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডের কথা। দুপরে আমি বাসায় ছিলাম, এমন সময় উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সংবাদ পাই বাজারে নাকি লবণ পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ লবণের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। পুরুষ নারী যুবক বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলের গন্তব্য লবনের দোকানে। যে যাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী লবণ কিনছেন। হাতে, ব্যাগে, বস্তায় করে সেসব লবণ নিয়ে ফিরছেন বাসায় । কাল থেকে দাম বেড়ে যাবে এমন গুজবেই এ ‘লবণকাণ্ড’।
‘কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে’- কবির এ কবিতার লাইন লবনকাণ্ডে আবারও সত্যি প্রমাণিত হলো। কান হারানোর সংবাদে কানে হাত না দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের চিলের পেছনে ভোঁ দৌঁড় দেওয়ার দৃশ্য এখন বারবার ফিরে আসে। কার কাছ থেকে দাম বাড়ার খবর পেলেন, তার সদুত্তর নেই কারও মুখে। কেহ শুনেছেন হয়তো পাশের বাড়ির ভাবির কাছে। কেহবা চায়ের দোকানে, কেহ হয়তো মোবাইল ফোনে বন্ধুর কাছে। পথচারীদের কাছেও শুনেছেন কেহ কেহ। অনেকে আবার লাইন দেখে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছেন হয়তো।
‘তাড়াতাড়ি বাজার থেকে লবণ আনো, কাল থেকে ২’শ টাকা কেজি হবে’ এমন গুজব মূহুর্তে মানুষের মুখে মুখে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সয়লাব হয়ে যায়। যে লবনের খুচরা মূল্য ৩০ টাকা কেজি, তা কয়েক মিনিটে ৪০, ৫০,১০০ এবং শেষ পর্যন্ত ১৫০ টাকায় পৌঁছে গিয়েছিল। পরে গুজব ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করে স্থানীয় প্রশাসন। এমনকি দাম বেশি নেওয়ায় করা হয়েছিল জেল জরিমানাও।
একটি পরিবারে মাসে লবণ সামান্যই দরকার হয়। সর্বোচ্চ দুয়েক কেজি। কিন্তু এই গুজবের ফলে অসচেতন ভোক্তারা মুহূর্তেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন ভোগ্যপণ্যের দোকানে এবং প্রয়োজন থেকে অনেক বেশি পরিমাণ ক্রয় করেন, এর ফলে বাড়তি চাপে নিমিষেই ফুরিয়ে যায় বিভিন্ন দোকানের লবণ। জনসাধারণের হঠাৎ অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগে মূহুর্তের মধ্যে ৩০ টাকার লবণ হয়ে উঠেছিল ১৫০ টাকা কেজি। প্রয়োজনের অধিক ক্রয়ের মানসিকতা থেকে বের হয়ে, দাম বৃদ্ধির সময় যতটুকু না হলেই নয় সে অনুযায়ী ক্রয় করলে বাজারে চাপ কম হয়, অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হয় না, ফলে মাত্রাতিরিক্ত মূল্যও বৃদ্ধি পাবে না। একই সাথে অতিরিক্ত মূল্যের লাগাম টানা সহজ হয়।
লবনের মতো করে কিছুদিন পরেই আমরা দেখেছি পিঁয়াজের দাম ৪০-৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত হওয়া। তার ধারাবাহিকতায় আটা চিনি মশলা পণ্যের রাতারাতি বৃদ্ধি। এই যে গুজব ছড়িয়ে, বাজারে কারসাজি করে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে সিন্ডিকেট, হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে অতিরিক্ত, কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারও তাদের খুঁজে বের করতে পারছে না। সিন্ডিকেটের কারসাজি যখন কাঁচাবাজার পর্যন্ত গড়ায়, তখন উচ্চবিত্ত থেকে নিন্মবিত্তের মানুষ সবার গায়ে লাগে। কেহ রেহাই পায় না এই যাঁতাকল থেকে। তবে ভোক্তারা সচেতন হলে কিছুটা হলেও সম্ভব হয় বাজারের চাপ কমানো কিন্তু ভোক্তাদের আচরণ উল্টো। তারা দাম বৃদ্ধি পেলে ক্রয় পরিমাণ বৃদ্ধি করে দেয় ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বৃদ্ধি পায়। অসচেতন ভোক্তার আচরণে অতিরিক্ত মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীরা ফায়দা লুটে নেয়।
স্বভাবতই কিছু দিন হইচই হয়ে নতুন ইস্যুতে হারিয়ে যাই আমরা। কিছু দিন গণমাধ্যমে বিষয়গুলো আলোচিত হয়, ব্যঙ্গাত্মক সচিত্র সংবাদ হয়, যেমন পেঁয়াজ নিয়ে হয়েছিল ‘পেঁয়াজের হালি ২০ টাকা’ শিরোনামে। এক দিনে কেজিতে দাম ৩০,৫০,১০০ টাকা মূহুর্তেই বৃদ্ধি পাওয়া, এটা কি স্বাভাবিক ঘটনা? মোটেও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আগ্রাসী মুনাফা অর্জনের মোহে সবই সম্ভব। সচেতন জনগণ যদি এ ধরনের কাঁচা মালামাল হঠাৎ অতিরিক্ত বৃদ্ধির সময় ক্রয় বন্ধ করে দেয়, বর্জন করে তাহলে ব্যবসায়ীরা পচনশীল পণ্য হওয়ায় বাধ্য হবে মূল্যের দাম কমাতে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি মরিচের ঝাল। ১০০ বা ১৫০ টাকার মরিচ হয়েছিল হাজার টাকা পর্যন্ত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইং এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন গণমাধ্যমে দাবি করেন, কাঁচা মরিচের দাম এতোটা বেড়ে যাওয়ার খবর সম্পূর্ণ গুজব। বৃষ্টির কারণে মরিচের দাম বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এতো বাড়েনি। এখানে অসচেতন ভোক্তার নীরবতা ও নির্লিপ্ততায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অল্প বৃদ্ধি পেলেই গুজব তৈরি করে তার কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ক্রেতার পকেট কাটে।
কেউ কেউ অদূর ভবিষ্যতে আরও মূল্য বেড়ে যাওয়ার ভয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য বাসায় মজুত করে রাখে। এতে করে জোগান ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতার কারণে অনেকেই অর্থ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পণ্য পেতে বিড়ম্বনার শিকার হয়। এর সুযোগ নিয়েই মূলত ঘন্টায় ঘন্টায় দাম বৃদ্ধি করে বিক্রেতারা। তাই এসব কাজে আমাদের ভোক্তাদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। দাম বৃদ্ধির সময়ে প্রয়োজনের বেশি বাজার নয় বরং দাম বাড়লে আমাদের ক্রয়ের পরিমাণ কমানো উচিত।
আমাদের মনে রাখা দরকার আমি, আপনি, আমারা সবাই একেকজন ভোক্তা। আমাদের জন্যই তৈরি হয় সকল পণ্য, আমাদেরকে কেন্দ্র করেই সব কিছু। তাই আমাদের প্রত্যেকের নিজের অধিকার নিয়ে সচেতন হওয়া দরকার। অতিরিক্ত লাগামহীন উর্ধগতির লাগাম টানতে ভূমিকা রাখতে পারে আমাদের সচেতনতা। গুজবে হুজুগে কান দেওয়া যাবে না, আমাদের ক্রয়ের পরিমাণ বিষয় সচেতন হতে হবে। আমাদের ভোক্তাদের সচেতনতাই পারে বাজারে সিন্ডিকেট উর্ধগতির লাগাম টানতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে।
লেখক- মোঃ খালেদ সাইফুল্লাহ ,শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।