দেশে ২৭৭ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৯ জনের মৃত্যু

 

এবারের ঈদ-উল-আজহার ছুটিতে সারা দেশে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৯ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫৪৪ জন।

dt-ad

শনিবার (৮ জুলাই) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

এই সময়ে সড়ক, রেল ও নৌ পথে সম্মিলিতভাবে ৩১২টি দুর্ঘটনায় ৩৪০ নিহত ও ৫৬৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রেলপথে ২৫টি ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও ১০ জন আহত হন এবং নৌ-পথে ১০টি দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ১৫ জন আহত ও ছয়জন নিখোঁজ হন।

ঈদযাত্রার দিন ২২ জুন থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার ৬ জুলাই পর্যন্ত ১৫ দিনের তথ্য দিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংগঠনটির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল। জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি বছর ঈদযাত্রায় এমন প্রতিবেদন তৈরি করে আসছে সংগঠনটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদের ছুটি এক দিন বাড়ানোর সুফল মিলেছে। দেশে ঈদযাত্রায় মোট যাতায়াতের প্রায় ৮% মোটরসাইকেলে যাতায়াত হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারির কারণে এবারের ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে।

dt-ad

তবে, পরিকল্পনার গলদে উত্তরাঞ্চলের পথে যানজটের ভোগান্তির পাশাপাশি কিছু কিছু রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতো এবারও দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।

২২ জুন থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৯ জন নিহত ও ৫৪৪ জন আহত হয়েছে। বিগত ২০২২ সালের ঈদ-উল-আজহায় যাতায়াতের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ১৫.১৬%, প্রাণহানি ৩৩.১১%, আহত ৪২.২৭% কমেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর যাবত দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেলের অবস্থান থাকলেও এবারের ঈদে দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান। ঈদে ৮৮টি ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান দুর্ঘটনায় ৯৩ জন নিহত ও ১৯৩ জন আহত হয়েছে। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩১.৭৬%, নিহতের ৩১.১০% এবং আহতের ৩৫.৪৪% প্রায়। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ৯১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৯৪ জন নিহত ও ৭৭ জন আহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২.৮৫%।

এই সময় সড়ক দুর্ঘটনায় ৮২ জন চালক, নয়জন পরিবহন শ্রমিক, ৩৫ জন পথচারী, ৪৭ জন নারী, ২৫ জন শিশু, ১৭ জন শিক্ষার্থী, পাঁচজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য (১ পুলিশ, ১ নৌ বাহিনী, ১ র‌্যাব, ১ বিজিবি, ১ সেনাবাহিনী), চারজন শিক্ষক, পাঁচজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নিহত হন।

সংগঠিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ২২.৩৭% মোটরসাইকেল, ২৩.০৫% ট্রাক-পিকআপ- কাভার্ড ভ্যান-লরি, ১৭.৫৭% ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক-ভ্যান-সাইকেল, ১৫.৭৫% বাস, ১০.২৭% কার- মাইক্রো-জিপ, ৫.৪৭% নছিমন-করিমন ট্রাক্টর-লেগুনা মাহিন্দ্রা ও ৪.৫৬% সিএনজি অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

সংগঠিত দুর্ঘটনার ২৬.৩৬% মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৫৪.৫১% পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ১০.১০% নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ০.৭২% ট্রেনের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের ঘটনা এবং ৬.৪৯% অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।

দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩৬.৪৬% জাতীয় মহাসড়কে, ২৯.২৪% আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৯.৬০% ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এছাড়াও সারা দেশে সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ১.৮% ঢাকা মহানগরীতে সংগঠিত হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল বলেন, “মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক ক্যান্সারের মতো বেড়ে যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনার মহামারী চলছে। দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ৩০% থেকে ৩৫% সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছে। অথচ জাতীয় নির্বাচন সামনে আসায় দেশের গণমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, “নতুন সড়ক পরিবহন আইন হলেও সড়ক নিরাপত্তায় গবেষণা না থাকা, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রকৃত দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকা, তদন্ত দুর্বলতা, আইনের দীর্ঘসূত্রিতাসহ নানা কারণে সড়ক নিরাপত্তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সরকারের স্বদিচ্ছা থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলছে না। অন্যদিকে গণপরিবহনকে বিকশিত না করে ব্যাপকভাবে ছোট ছোট পরিবহন সড়কে নামানোর কারণে পরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি বাড়ছে।”

এতে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি তাওহীদুল হক লিটন, যুগ্ম মহাসচিব মনিরুল হক, প্রচার সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল, বিশিষ্ট সমাজকর্মী মোহাম্মদ মহসিন প্রমুখ।

এবার ঈদে সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ:

১. ঈদের ৩ দিন আগে থেকে জাতীয় মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা অমান্য।

২. দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের অবাধে চলাচল।

৩. অতিরিক্ত গতি, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।

৪. উল্টোপথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।

৫. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন।

৬. দ্রুতগতির বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধীরগতির পশুবাহী ট্রাক-পিকআপ চলাচল।

দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ:

১. মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মতো ছোট ছোট যানবাহন আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা।

২. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহনের ফিটনেস দেওয়া।

৩. ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা।

৪. সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা।

৫. সড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং অঙ্কন ও স্থাপন করা।

৬. সড়ক পরিবহন আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করা।

৭. ঈদের আগে তিন দিন আগে থেকে জাতীয় মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা।

৮. গণপরিবহন বিকশিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা।