ক্রমেই ভয়ংকর হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার প্রাক-বর্ষা জরিপের ফলাফল বলছে, রাজধানীর প্রায় সব বাসিন্দাই ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকিতে। আর জরিপের আওতাভুক্ত ৯৮ ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৫টিই ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। এর সঙ্গে ভুল নগরায়ণের সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকরা।
কীটতত্ত্ববিদরাও বলছেন, দেশে নগরায়ণের পরিসর বেড়েছে। উপজেলা এবং কোনো কোনো ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্তও এর প্রসার ঘটেছে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বিশেষ করে ঢাকায় এডিস মশার যে প্রজাতিটি ডেঙ্গু ছড়াতে ভূমিকা রাখছে সেটি মূলত কম গাছপালা ও কংক্রিটে আচ্ছাদিত জায়গায় বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনায় অনুমান করা হচ্ছে, এবার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। কয়েক দিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে গেছে গড়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যদিও এ পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ নয়, যেসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এ নিয়ে রিপোর্টিং করে কেবল তাদের তথ্য। এছাড়া অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হলেও তাদের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দেয়া হয় না। আবার অনেক রোগী বাসায় থেকেও চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাজধানীসহ সারা দেশেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়েছিল ২০১৯ সালে। ওই সময়ের বিপর্যয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক একটি গবেষণা চালান। নগরায়ণের সঙ্গে ডেঙ্গু বৃদ্ধির সম্পর্ক নিয়ে করা ওই গবেষণায় উঠে এসেছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বংশবৃদ্ধি পাচ্ছে এডিস মশার। পুরো রাজধানীতে ওই বছর ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লেও উচ্চঝুঁকি ছিল ৩০ শতাংশ এলাকায়। সেগুলো হলো উত্তরা, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল ও কুর্মিটোলা। ওই এলাকাগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। অন্যান্য এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল তুলনামূলক সহনীয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, জনঘনত্ব বিবেচনায় হাজারীবাগ, লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর ও শ্যামপুর ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও এগুলোর চেয়ে কম গাছপালা ও বেশি কংক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকায় ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন ও দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল। ডেঙ্গুর সঙ্গে নগরায়ণের সম্পর্কের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, যেসব এলাকার ভূমি অতিরিক্ত কংক্রিটে আচ্ছাদিত, গাছপালা ও স্বচ্ছ পানির খাল-জলাশয় কম সেখানকার তাপমাত্রা বেশি। আর ওইসব এলাকার বাসিন্দারাই বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। অন্যদিকে দারুসসালাম, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের মতো এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সহনীয়।’
আশঙ্কার কথা হলো, সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত প্রতিবেদেনে ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকির এলাকার পরিধি বেড়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছিল রাজধানীর ৩০ শতাংশ, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৫০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে মূলত ভুল নগরায়ণের সম্পর্ক। বিশেষ করে গত তিন বছরে উন্নয়ন ও সৌন্দর্যের নামে ব্যাপক গাছ কাটার পাশাপাশি অনেক খোলা জায়গা কংক্রিটে ঢেকেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। রাজধানীতে আশঙ্কাজনক হারে কংক্রিটের আচ্ছাদন বাড়ছে বলে তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। তাদের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ঢাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ ২০ বছরের ব্যবধানে শোষণক্ষম ভূমি কমেছে ২৬ শতাংশ। রাজধানীতে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ বর্তমানে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। দুই দশকে সবুজ এলাকা কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
বিআইপির সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক গবেষণা বলছে, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পার্ক ওসমানী উদ্যানের (শহীদ মতিউর) ৫২, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩৭, বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কের ৩৭ ও বনানী পার্কের ৪২ শতাংশ কংক্রিটে আচ্ছাদিত। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অনুমোদন নিয়ে বাহাদুর শাহ পার্কের মতো ঐতিহাসিক পার্কেও গত বছর নতুন করে কংক্রিট বসানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিনিয়ত রাজধানীর ভূমি এভাবে কংক্রিটে ঢেকে ফেলার কারণে এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করায় আরো জটিল আকার ধারণ করবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বৃক্ষ নিধনের সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন মশা নিয়ে জাপানের কানাজোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘এডিস মশার দুটি প্রজাতির মধ্যে ইজিপ্টি ঢাকার নাগরিকদের মাঝে ডেঙ্গু ছড়াতে ভূমিকা রাখছে। এ প্রজাতির মাশা এমন পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে যেখানে গাছপালা ও কাঁচা মাটি কম। বিপরীতে কংক্রিটে আচ্ছাদিত ভূমি, বাসাবাড়ি এদের বাসবাসের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা। তাই অপরিকল্পিত নগরায়ণ যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের ডেঙ্গু বিপর্যয়ের পেছনে ইজিপ্টি বা আবাসিক এডিস মশার ভূমিকা ছিল। ফলে তখনকার সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণ বড় কারণগুলোর একটি এ কথা সঠিক। কিন্তু এখনকার ডেঙ্গু পরিস্থিতি বদলে গেছে। এডিস মশার দ্বিতীয় প্রজাতি অ্যালবোপিকটাস আবার গাছে ও বনে থাকতে পছন্দ করে। রাজধানীতে এ প্রজাতিও বর্তমানে আক্রমণ করছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে পরিকল্পিত নগরায়ণের ভূমিকা রয়েছে। ঢাকায় যদি পর্যাপ্ত গাছ থাকত, পর্যাপ্ত খোলা জায়গা থাকত এবং মাটি থাকত তাহলে আবাসিক বা ইজিপ্টি প্রজাতির আক্রমণ থেকে নগরবাসী যেমন রক্ষা পেত পাশাপাশি সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্টদেরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সহজ হতো। সুস্থ জীবনধারণের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই।’
ভুল নগরায়ণ ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিধনের নামে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের অপচয় না করে প্রাকৃতিকভাবে সমাধানে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা নগরীতে বৃক্ষ রোপণ করছি। একইভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছি। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ তো একদিনে হয়নি। সমস্যা সমাধানে আমাদের জায়গা থেকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’