১০০ বছর পরেও কেন টাইটানিক মানুষকে টানে

কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই মাইলেরও বেশি গভীরে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডুবে আছে এক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। মরচে ধরা, ক্ষয়ে যাওয়া সেই ধ্বংসাবশেষটি আজও ইতিহাসবিদ, অনুসন্ধানকারী, রহস্যপ্রিয় অভিযাত্রীককে আকৃষ্ট করে।

জাহাজটির নাম ‘টাইটানিক’। গত কয়েক দশক ধরে টাইটানিককে নিয়ে বই, চলচ্চিত্র, ভিডিও গেমসহ নানা কিছু তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্তত সাতটি জাদুঘরে এখনো অমর হয়ে আছে টাইটানিকের নিদর্শনগুলো। ডুবে যাওয়ার ১১১ বছর পরও খবরের শিরোনাম হচ্ছে টাইটানিক। কি বিস্ময়!

গত ১৮ জানুয়ারি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে পড়ে থাকা টাইটানিক জাহাজ দেখতে পাঁচ আরোহী নিয়ে সমুদ্রে ডুব দেয় মার্কিন কোম্পানি ওশানগেটের ছোট আকৃতির ডুবোযান টাইটান। এর ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পরই এটির সঙ্গে উপরে থাকা জাহাজের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান।

এরইমধ্যে এ ডুবোযানটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন কোস্টগার্ড। আর যানে থাকা সব যাত্রীরই মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। সাবমেরিনে থাকা যাত্রীরা হলেন-ব্রিটিশ ব্যবসায়ী হামিশ হার্ডিং (৫৮), ব্রিটিশ-পাকিস্তানি ব্যবসায়ী শাহজাদা দাউদ (৪৮) ও তার ছেলে সুলেমান দাউদ (১৯), ওশনগেটের শীর্ষ নির্বাহী স্টকটন রাশ (৬১) ও সাবমেরিনটির চালক ও ফরাসি নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা পল হেনরি নারগিওলেট (৭৭)।

বিশেষ স্থান দখল করে আছে টাইটানিক

১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টাইটানিক মানব ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ১৯৯৭ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জেমস ক্যামেরুন টাইটানি নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছেন। সেই গল্প বিশ্বের কোটি কোটি দর্শককে মুগ্ধ করেছে। অস্কার জয় করেছে চলচ্চিত্র।

টাইটানিকের ইতিহাসবিদ ডন লিঞ্চ বলেন, এটি একটি অবিশ্বাস্য গল্প। বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ ছিল টাইটানিক। সেটি ডুবে যেতে পারে বলে কেউ কল্পনাও করেনি। বহু ধনী ও বিখ্যাত মানুষ সেদিন জাহাজটির যাত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু সবার বিশ্বাস ও কল্পনাকে মিথ্যা প্রমাণ করে জাহাজটি একটি আইসবার্গের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়।

তারপর আটলান্টিকের অতলে ডুবে থাকা টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষের স্থানটি সারা বিশ্বের কাছেই বিশেষ হয়ে ওঠে। অনেক গবেষক ও অভিযাত্রী আগ্রহী হয়ে ওঠেন জায়গাটি দেখার জন্য।

টাইটানিক সম্পর্কে কয়েকটি কথা

১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে আটলান্টিক মহাসাগরে একটি আইসবার্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায় টাইটানিক। জাহাজটিতে দুই হাজারের বেশি যাত্রী ছিল। এদের মধ্যে ৭০০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। বাকি দেড় হাজার জনের সলিল সমাধী হয়।

১৯৮৫ সালে নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় ৩৭০ মাইল দূরে সমুদ্র থেকে সাড়ে ১২ হাজার ফুট নিচে আবিষ্কৃত হয় টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ।

একটি ব্যথাদীর্ণ মানবিক গল্প

সান দিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ‘দ্য টাইটানিক স্টোরি: হার্ড চয়েস, ডেঞ্জারাস ডিসিশনস’ বলেন, সাধারণত কোনো জাহাজ যখন ডুবতে শুরু করে, তখন খুব দ্রুতই সেটি ডুবে যায়। কিন্তু টাইটানিক ডুবতে সময় লেগেছিল ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য মানবিক গল্প তৈরি হয়েছিল নিশ্চয়। পরে মানুষ কল্পনায় অনেক গল্প তৈরিও করেছে। যেমন প্রথমে নারী ও শিশুদের উদ্ধার, কেউ শুধু অবিরাম ব্যান্ড বাজিয়েছিল, কেউ পকেটে থাকা সমস্ত জিনিস সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিল।

এসব গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র, নাটক, তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালে চীনে ‌‘দ্য সিক্স’ নামে ডকুমেন্টারি তৈরি হয়েছে।

যে গল্পের শেষ নেই

টাইটানিক মিউজিয়াম অ্যাট্রাকশনের কিউরেটর পল বার্নস বলেছেন, টাইটানিক একটি শেষ না হওয়া গল্প। তিনি ২০১২ সালে সিএনএনের এক প্রবন্ধে বলেন, টাইটানিক দুর্ঘটনায় যারা বেঁচে ছিলেন তারা নিজেরাই এক একটি গল্প। যারা মারা গেছেন, তারাও গল্প হয়ে গেছেন।

যখন হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার কথা আসে, তখন অনেকেই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টম্বরে সন্ত্রাসী হামলার কথা বলেন। অনেকে স্মরণ করেন টাইটানিক দুর্ঘটনার কথাও। দুটি দুর্ঘটনাই তাদের ভয়াবহতার জন্য এখন্য স্মরণীয়। তাই ওই দুটো ঘটনা নিয়ে এখনো নাটক, সিনেমা, ডকুমেন্টারি, গান তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে নিশ্চয়। এ গল্পের আসলে শেষ নেই।