আবারও সেই পুরনো রীতি। রোজায় চাহিদা বাড়ে, এমন বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে আগেভাগেই। এই প্রবণতা গত প্রায় এক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে। আগে রোজার আসার সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়ত, এ নিয়ে শুরু হতো সমালোচনা। তবে পরে প্রবণতা পাল্টেছে, দাম বেড়ে থাকে রোজা শুরু হওয়ার এক মাস বা তার চেয়েও বেশি আগে থেকে।
আগামী ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হচ্ছে রোজা। আর তার দেড় মাস আগে থেকে জানুয়ারির শুরু থেকেই রমজানে চাহিদা বাড়ে এমন ৫ পণ্যের মধ্যে ডাল, চিনি ও তেলের—বাজার বাড়তে শুরু করেছে। তবে শুল্ক কমানোয় খেজুরের বাজার কিছুটা কমেছে। কমতির দিকে ছোলার দরও।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন বাজার ও পাড়া-মহল্লায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি ছোট মশুর ডালে ৩০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকায়, ১০ টাকা বেড়ে খোলা ও প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়, এবং সয়াবিন তেলে ৫ টাকা বেড়ে প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকায়।
শুল্ক কমায় খেজুরের দাম পাইকারিতে কেজিতে কমেছে ৫০ টাকা পর্যন্ত, তবে এই প্রভাব এখনও পড়েনি খুচরা দোকানগুলোতে।
রিয়াজুদ্দিন বাজারে আসা ক্রেতা মো. নাসিরুদ্দিন বলেন, “বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। খেজুরের দাম কমেছে বলে যে দাবি করছে দোকানদাররা, এটাও আসলে আরও কমা উচিত। শুল্ক তো অনেকটুকুই কমেছে, দাম সেই হিসেবে কমেনি। অথচ দেখেন তেল-চিনির দাম বেড়ে গেছে।”
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। তবে পরিবহন খরচ বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে কিছু পণ্যে চাপ তৈরি হতে পারে।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্প মূল্যে টিসিবি যে খাদ্য পণ্য বিতরণ করে, রমজানকে কেন্দ্র করে সেই তালিকায় খেজুর ও ছোলা যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ। তিনি বলেন, “রমজানে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে।”

গত ৮ জানুয়ারি টিসিবির তথ্য বলছে, প্রতি কেজি চিনির দর ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, যা গতবছর ক্রেতারা কিনেছিলেন ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, তবে এক মাস আগে দাম অনেকটাই কম ছিল।
ছোট মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে, যা বছরখানেক আগে ক্রেতারা কিনেছেন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়।
বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে লিটার প্রতি ১৮৯ থেকে ১৯৮ টাকায়, যা গত বছর ক্রেতারা কিনেছেন ১৭৩ থেকে ১৭৫ টাকায়।
সংস্থাটির হিসাবে খেজুর ও ছোলার দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। তবে টিসিবির তথ্য সব জায়গায় মেলে না।
‘ব্যবসায়ী মাস’
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নেতৃবৃন্দরা বলেন, “রমজানকে ঘিরে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সারা বছর যদি ২০ শতাংশ খেজুর লাগে, রমজানে লাগে ৮০ শতাংশ। রমজানে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে খেজুর। আর তেল, চিনি, ডাল—এগুলো প্রায় দ্বিগুণ চাহিদা হয়। এই চাহিদাকেই সুযোগ নেয় ব্যবসায়ীরা।”
কিছু কিছু ব্যবসায়ী সারা বছরের ব্যবসা রোজাতেই করে ফেলতে চান বলে মন্তব্য করে তারা বলেন, “এটা নীতি ও নৈতিকতা পুরোপুরি বিসর্জন এবং রমজানের মূল চেতনারও পরিপন্থী। সারা বিশ্বে রমজানে স্পেশাল প্যাকেজ দেয়। আর বাংলাদেশে উল্টো চরিত্র।”
কোন পণ্য আমদানিতে কত শুল্ক
রমজানকে সামনে রেখে সরকার খেজুর আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি কমিয়েছে, তবুও শুল্ক এবং করের মোট হার এখনও ৪২.২০ শতাংশে রয়েছে।
গত ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ২৫ শতাংশ থেকে কাস্টমস ডিউটি ১০ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
এনবিআর জানিয়েছে, রোজায় খেজুরের মূল্য ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে রাখার লক্ষ্যে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে রমজানে খেজুরের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।

খেজুর ছাড়া সকল নিত্যপণ্য আমদানিতে শুল্ক সবসময় ছাড় দেওয়া হয়। তাই রমজানে আলাদা করে কমানো হয় না।
বর্তমানে চিনি, সয়াবিন তেল ও ডালে শুল্ক ছাড় রয়েছে। বাজেটের সময় পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে প্রতি কেজিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর নির্ধারণ করা হয়।
চিনি আমদানিতে প্রতি কেজিতে রেগুলেটরি ডিউটি ১৫ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ ও ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর রয়েছে। এছাড়া প্রতি টন চিনি আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ৩,০০০ টাকা।
খেজুরের দাম কি আরও কমা উচিত ছিল?
শুল্ক কমানোয় খেজুরের পাইকারি বাজারের পাশাপাশি কিছু খুচরা বাজারে এর কিছুটা প্রভাব পড়েছে, কেজিতে ৫০ টাকার মতো দাম কমেছে। তবে ক্রেতারা বলছেন ‘আরও কমা উচিত’।
পাইকারিতে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হওয়া মরিয়ম খেজুর রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় বিক্রি হচ্ছে ১,২০০ থেকে ১,৪০০ টাকা কেজি দরে।
রিয়াজুদ্দিন বাজারের খেজুর বিক্রেতা মো. হুসাইন জানান, “রমজানকে কেন্দ্র করে যে শুল্ক কমিয়েছে, মূলত সেটার প্রভাবই এটা। তবে রমজানে প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়, এতে খেজুরের বাজার কিছুটা চড়া থাকে।”
তিনি জানান, নিম্ন থেকে মাঝারি মানের খেজুর ১৮০ থেকে ৫০০ টাকা, মাঝারি মানের খেজুর ৫৫০ থেকে ৭০০, উচ্চমানের হচ্ছে ৭৫০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুদ্দিন আহমেদ বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর শুল্ক কমানোর প্রজ্ঞাপনের পর আমদানি করা খেজুর এখনও বাজারে আসেনি।
“শুল্ক কমানোর আগেই তো রমজানের মাল চলে আসছে। তাই উচিত ছিল আরও আগে কমানো। তবুও আমরা চেষ্টা করছি যেন শুল্ক কমানোর সুফল জনগণ পায়।”
খুচরা বিক্রেতারা ক্রেতাদের বেশভূষা দেখে আলাদা দাম চায় এবং এলাকা ভেদেও দাম ভিন্ন হয়।