সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পে পাঁচ বছরে ১৭৯ দুর্ঘটনা, নিহত ৩৮

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন কাজ করছেন হাজার হাজার শ্রমিক। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নামে পরিচিত এই শিল্পে গত পাঁচ বছরে মোট ১৭৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৩৮ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১৮৮ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় চট্টগ্রামের উপকূলে প্রায় ১৬০টি ছোট-বড় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড থাকলেও বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ২৩টি। এই ২৩টি ইয়ার্ডকে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাকি ইয়ার্ডগুলো বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।

বিলস ডিটিডিএ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, গত পাঁচ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে হতাহতের সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার দেওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ৪৭টি দুর্ঘটনা ঘটে। ওই বছর ১৩ জন শ্রমিক নিহত হন এবং আহত হন ৪৪ জন। ২০২২ সালে ২২টি দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হন। ২০২৩ সালে ৩৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭ জন, আহত হন ২৮ জন। ২০২৪ সালে ২৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭ জন এবং আহত হন ৩৬ জন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হন।

এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুর্ঘটনার সংখ্যা কখনো কিছুটা কমলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বরং কিছু বছরে দুর্ঘটনা ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিনই তারা নানা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। ভারী লোহার পাত কাটা, অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার, জাহাজের ভেতরে সংকীর্ণ জায়গায় কাজ করা—সবকিছুই অত্যন্ত বিপজ্জনক। সামান্য অসতর্কতায় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের কাজে নামতে হয়।

গত ৫ জানুয়ারি ‘কেআর গ্রিন শিপইয়ার্ড’ নামে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় দুই শ্রমিক নিহত হন। তারা ওই কারখানার নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি। এই ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সহকর্মীরা জানান, দুর্ঘটনার পরও কাজ বন্ধ না রেখে দ্রুত কার্যক্রম চালু করা হয়।

শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজভাঙা শিল্পে আহত হওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত ব্যাপার। কখনও রাডার বা ভারী যন্ত্রাংশ ভেঙে পড়ে শ্রমিক চাপা পড়ছেন। কখনও ম্যাগনেটের হুক লাগাতে গিয়ে গুরুতর আহত হচ্ছেন। আবার কোথাও অগ্নিকাণ্ড, কোথাও ভারী লোহার খণ্ড ওপর থেকে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। অক্সিজেন টিউবের জয়েন্ট বিস্ফোরণ কিংবা জাহাজ কাটার সময় আগুনের ফুল্কি ছিটকে পড়েও শ্রমিক আহত হওয়ার বহু ঘটনা রয়েছে।

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বলেন, একসময় সীতাকুণ্ড এলাকায় প্রায় ১৬০টি ছোট-বড় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল। বর্তমানে হালনাগাদ সদস্য সংখ্যা ৮৫ জন। এর মধ্যে মাত্র ২৩টি গ্রিন শিপইয়ার্ড চালু রয়েছে। বাকিগুলো সনাতন পদ্ধতির এবং বর্তমানে কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত।

শিপইয়ার্ডের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশীয় বাজারে দামের সামঞ্জস্য না থাকা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে অনেক ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বর্তমানে চালু থাকা সব গ্রিন শিপইয়ার্ড আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব ইয়ার্ডে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে উন্নত।

তার মতে, বর্তমানে সব মিলিয়ে শিপ ব্রেকিং শিল্পে অন্তত ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। গ্রিন শিপইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সনাতন ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি এতটা ইতিবাচক নয়। জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, শ্রমিকরা এখনও চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি এই খাতে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। শ্রমিকদের নিয়মের চেয়ে বেশি সময় কাজ করানো হলেও কাজের উপযুক্ত মজুরি দেওয়া হয় না।

তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন মানা হচ্ছে না। নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকলেও তা নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না। দুর্ঘটনা ঘটলে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। এসব বিষয় নিয়ে কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদফতরকে অবহিত করা হয়েছে, তবে বাস্তব পরিবর্তন খুবই সীমিত।

তপন দত্ত জানান, ২০২৫ সালে শুধু গ্রিন শিপইয়ার্ডগুলোতেই ৪৮টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। আর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে দেওয়া হয় আড়াই লাখ টাকা। তবে এই অর্থ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পূরণে যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে এই শিল্প টেকসই হবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু গ্রিন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, বাস্তব অর্থে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা, কাজের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্প আজও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের প্রতীক হয়ে আছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিটি বছরই কোনো না কোনো শ্রমিক এই শিল্পে প্রাণ হারাচ্ছেন। শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতেও এই মৃত্যুমিছিল থামবে না—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা