মনের ভেতর একটা চাপা ধুকধুকানি কাজ করে প্রায়ই, আজও কি শুনতে হবে সেই নিষ্ঠুর খবর? মঙ্গলবার ১৮ নভেম্বর, সেই শঙ্কাই আবার সত্যি হলো। কক্সবাজারে আরও এক বুনো হাতি পড়ে রইল নিথর হয়ে। সেই পুরোনো, নিষ্ঠুর, অভ্যাসে পরিণত অস্বাভাবিক মৃত্যুই। মনে হয় আমাদের দেশে বুনো হাতিদের ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই, বয়স বা রোগে মারা যাওয়ার সুযোগটুকুও যেন আমরা তাদের কেড়ে নিয়েছি।
আর হাতির মৃত্যু নিশ্চিত করার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হয়ে উঠেছে মানুষের পাতানো বৈদ্যুতিক ফাঁদ। গতকালের ঘটনাটিও ঘটেছে ঠিক সেই পরিচিত ভূগোলেই, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায়।
রাঙামাটির অরণ্যে বুনো হাতি
প্রতিবারের মতোই আঘাতটা নতুন নয়, কিন্তু তবুও মনের ভেতর একটা তীব্র ব্যথা আবার মাথা চাড়া দেয়, আর কত? আর কতবার এমন করে আমরা আমাদের শেষ বুনো হাতিগুলোকে হারাব?
মূলত এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা কক্সবাজার আর গারো পাহাড় অঞ্চলে বেশি ঘটে। এবারেরটা যেমন হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায়। মঙ্গলবার ভোরে স্থানীয় লোকজন রাজাপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ হরিণমারা এলাকায় একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হাতির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে।
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে উখিয়া রেঞ্জের সদর বিটের দোছড়ি রফিকের ঘোনা এলাকায় স্থানীয়রা মৃত অবস্থায় অপর একটি বন্য হাতিটিকে দেখতে পান।
মঙ্গলবারের হাতিটির বিষয়ে কথা হয় উখিয়ার দুছড়ি বন বিট কর্মকর্তা এমদাদুল হক রনি সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বন বিভাগ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে খবর পায়। দশটার দিকে পৌঁছে হাতিটির মৃতদেহ পায়। হাতিটিকে বিদ্যুতের ফাঁদে ফেলে মারা হয়েছে বলে ধারণা করছি। স্থানীয়রা ধান খেত এবং বাড়ি-ঘর হাতির থেকে রক্ষা করতে চারপাশে জিআই তার দিয়ে রাখে। সেখানে আবার বাড়ি থেকে বিদ্যুতের লাইন দিয়ে দেয়। এ তারের সংস্পর্শে মারা পড়ে হাতি। এখানেও এটাই ঘটেছে।’
বিপদে আছে এশীয় হাতি
বিশ্বে এখনও চার লাখের বেশি আফ্রিকান হাতি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমাদের মহাদেশের গর্ব, এশীয় বুনো হাতি? সংখ্যা শুনলে মন খারাপ হয়ে যাবে, মাত্র চল্লিশ হাজারের মতো। অথচ বিংশ শতকের শুরুর দিকে এই সংখ্যা ছিল এক লাখের কাছাকাছি।
যে ১৩টি দেশে এশীয় হাতি টিকে আছে, তার মধ্যে আমি মনে করি, সবচেয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায় আছি আমরা, বাংলাদেশ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর ২০১৬ সালের জরিপে দেখা গেছে, দেশে স্থায়ী বুনো হাতি ছিল মাত্র ২৭০টি। এখন তার কতটা বেঁচে আছে, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। বন বিভাগের হিসাবই বলছে, ২০১০ থেকে ২০২৪—এই দেড় দশকে মানুষের আক্রমণ, বিদ্যুতায়িত হওয়া, রেললাইন বা সড়কে দুর্ঘটনা এভাবে মারা গেছে অন্তত ১১৫টি হাতি।
অবশ্য মাঝে মাঝে বনাঞ্চল থেকে হাতির বাচ্চা জন্মের খবর এলে খানিকটা আশার আলো দেখি, কিন্তু সামগ্রিক ছবিটা ভয়ংকরই রয়ে গেছে। আমার ধারণা—বাংলাদেশে এখন স্থায়ী বুনো হাতির সংখ্যা ২০০-র আশপাশে।
কক্সবাজারের বুনো হাতি
বছর দশেক আগের সেই জরিপে দেখা গিয়েছিল—বাংলাদেশের স্থায়ী বুনো হাতির অর্ধেকেরও বেশি, গড়ে প্রায় ১৪৭টির বিচরণ এলাকা কক্সবাজার-লামার বনাঞ্চলে। তখনও দেশের অন্য জায়গার তুলনায় এখানকার হাতিরা কিছুটা হলেও ভালো ছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দেশে সবচেয়ে সংকটে আছে কক্সবাজারের হাতিই। গারো পাহাড়ের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।
এই বিপর্যয়ের শুরু, যখন কক্সবাজার ও টেকনাফের পাহাড়ি অরণ্যে গড়ে উঠল বিশাল রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির তখন। হাতিদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত চলাচলের করিডোরগুলো হঠাৎ করেই আটকে গেল। মানুষ আর প্লাস্টিকের সমুদ্রে পরিণত হলো একদা সবুজে ভরা পাহাড়-অরণ্য।
গারো পাহাড় এলাকায় বুনো হাতির পাল ও উৎসুক জনতা
টেকনাফ গেম রিজার্ভ ছিল হাতিদের সেরা আশ্রয়স্থলগুলোর একটি। এখন সেখানে বুনো হাতি তো বটেই কোনো বন্যপ্রাণীর খাবার নেই। শুধু রোহিঙ্গারা নয়, হাতির বিচরণের বিভিন্ন জায়গায় বসতি গেড়েছে বাঙালিরাও। হাতির জন্য এ এলাকা এখন একেবারেই অনিরাপদ।
এদিকে এসেছে নতুন এক বিপদ—চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। বন বিভাগের হিসাব বলছে, দেশে হাতির বিচরণ আছে, এমন তিনটি সংরক্ষিত অরণ্য—চুনতি ও ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্ক—মিলিয়ে প্রায় ২৭ কিলোমিটার বন কেটে গেছে এই রেলপথ। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি হাতি চলাচলের করিডোর সরাসরি অতিক্রম করেছে এই পথ।
কিছুদিন আগে কক্সবাজার যাওয়া-আসার পথে চুনতি দিয়ে ট্রেন পার হওয়ার সময় জানালায় চোখ আটকে ছিল—হয়তো এক ঝলক দেখা মিলবে কোনো বুনো হাতির। কিন্তু দৃশ্যটা কল্পনার মধ্যেই আটকে রইল। বুকের ভেতর তখন শুধু একটা কথাই বাজছিল, যে সব এলাকায় তারা থাকত, যে পথে তারা চলত, সেসব একে একে দখল করে নিচ্ছি আমরা, নির্মমভাবে।
আসলে শুধু কক্সবাজার নয় চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, গারো পাহাড়—দেশের কোথাও হাতিরা নিরাপদে নেই। চট্টগ্রামের আনোয়ারার কেইপিজেডের পাহাড়ি অঞ্চলেও বিচরণ করা কয়েকটি হাতি এখন মৃত্যু আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
হাতিদের তবে বাঁচার অধিকার নেই?
প্রাণী অধিকারকর্মী অনন্যা ফারিয়া বন বিভাগের চুনতি অভয়ারণ্যের বন পুররুদ্ধার বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য। শেরপুর এলাকার হাতি নিয়েও কাজ করছেন। অনন্যা বলেন, ‘স্থানীয়দের হাতি মারার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় বিদ্যুতের ফাঁদ। সাধারণত ধান ক্ষেত আর বাড়ির আশপাশে এই তার দেওয়া হয়। তারপর পল্লী বিদ্যুতের তার বা জেনারেটরের মাধ্যমে এতে বিদ্যুত দেওয়া হয়। আমার জানা মতে, ২০২১ এর ৯ নভেম্বর থেকে পরের কিছুদিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫টি হাতি হত্যার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শেরপুরে একটি হাতিকে গুলি করে মারা হয়েছে, বাকিগুলোকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আর ২০২০ সালে ১১টি হাতি মারা যায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার এলাকায়। সাতটি মারা যায় বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগে, বাকিগুলো গুলিতে।’
তা হলে হাতি মৃত্যু ঠেকাবার উপায় কী জানতে চাইলে অন্যন্যা বললেন, ‘আসলে অনেকগুলো বিষয় চলে আসে। একটি হলো, অনেক ক্ষেত্রেই হাতিকে বিদ্যুতায়িত করতে স্থানীয়রা পল্লী বিদ্যুতের লাইন ব্যবহার করেন। পল্লী বিদ্যুতের নিজেদের এসব বিদ্যুতের লাইনের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তা ছাড়া হাতি হত্যার ঘটনায় মামলা নিষ্পত্তি হয়ে সাজার নজির তৈরি জরুরি, নইলে কাগজে কলমে কঠোর আইন থাকলেও তা আমাদের হাতিদের সুরক্ষা দিতে পারবে না।’
দেশের বিখ্যাত বন্যপ্রাণী গবেষক ড. রেজা খান অনেকটা হতাশার সুরেই বললেন, ‘আসলে আমরা কোনো বিষয় ঘটে যাওয়ার পর এটা নিয়ে মাতামাতি করি। কিন্তু কোনো কিছু করার সময় কিংবা আগে চিন্তা করি না। হাতি চলাচলে পথের ওপর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, মানুষের বাড়ি-ঘর উঠেছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন হাতি-মানুষ সংঘাত আর মৃত্যু খুব সাধারণ বিষয়। রোহিঙ্গা বসতির কথা ধরুন, এ দেশে যখন মিয়ানমার থেকে তারা শরনার্থী হিসেবে আশা শুরু করে তখন ভাবা উচিত ছিল এদের কোথায় রাখা যেতে পারে। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে সে রকম কোনো পরিকল্পনা না থাকায় এই এলাকায় হাতি-মানুষ কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর হাতি তো সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। কোথায় নেবেন? বাংলাদেশে কী এমন জায়গা আছে?’
তাহলে কী হাতিদের বাঁচানোর কোনো উপায় নেই? জবাবে এই অভিজ্ঞ প্রাণী বিজ্ঞানী বললেন, ‘এখন সরকার ও স্থানীয় জনসাধারণকে হাতিদের সঙ্গে মানিয়ে বসবাসের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তেমনি হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষকে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এর প্রক্রিয়া তরান্বিত করতে হবে।’
দীর্ঘদিন শেরপুরের বুনো হাতি নিয়ে কাজ করছেন গারো যুবক কাঞ্চন মারাক। তিনি বলেন, ‘শেরপুর-জামালপুর এলাকায় বেশির ভাগ হাতি মারা হয় বিদ্যুতায়িত করে। সত্যি বলতে, গত কয়েক বছরের মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এমন হাতির খবর আমার জানাই নেই। এখানে বিদ্যুতায়িত করার ক্ষেত্রে বেশি ব্যাবহার করা হয় জেনারেটর।’
‘সমস্যা হলো হাতির জন্য পর্যাপ্ত খাবার নেই পাহাড়ে। আর বন-পাহাড়ের কাছেই মানুষের ধানক্ষেত, বাড়ি। ফসল আর নিজেদের রক্ষায় মানুষ জিআই তারের ঘেরাও দেয়। তারের স্পর্শে আসে বিদ্যুতায়িত হয়ে প্রাণ যায় হাতির। কখনও কখনও এই শকে শুরুতে হাতির মৃত্যু না হলেও জেনারেটর সামনে উপস্থিত মানুষটি পাওয়ার বাড়িয়ে দেয়। আর অতিরিক্ত বিদ্যুতের শক খেয়ে জায়গাতেই হাতির হ্ৎকম্পন থেমে যায়।’
কাঞ্চন মারাকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তাহেলে হাতিদের বাঁচাব কীভাবে? এই যুবকের উত্তর, ‘প্রথম কথা মানুষকে হাতি সম্পর্কে বুঝতে হবে। প্রাণীটির আচার-আচরণ, অভ্যাস বুঝতে হবে। জেনারেটরের বদলে ফসল রক্ষায় সোলার ফেন্সিং ব্যবহারে উৎসাহিত করা যেতে পারে। জেনারেটরের বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণও করা যায় চাইলে। সরকারিভাবে বা কোনো বেসরকারি সংস্থা এ বিষয়ে সহায়তা করতে পারে। এটা হলে হাতি শক খেলেও কেবল ব্যাথা পাবে। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি সেটা মানুষের সচেতনতা।’
বন বিভাগের হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ও কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক জহির আকন বলেন,‘এ ধরনের বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয়দের হাতির আক্রমণে হতাহতের ঘটনা কিংবা ফসল ধ্বংসে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এ ধরনের বৈদ্যুতিক ফাঁদ বা অন্য কোনো উপায়ে হাতি মারা হলে বন্যপ্রাণী আইনে বিচারের সুযোগ আছে। আমরা মামলাও দিই। আমার ধারণা আইনটা হাতি রক্ষার জন্য ঠিকই আছে। তবে এর প্রয়োগ যেন আরও ভালোভাবে হয় সে বিষয়ে আরেকটু ভাবতে হবে। ‘
।