চট্টগ্রামে জ্বর, সর্দি-কাশির প্রকোপ

বর্ষা ঋতুতে জ্বর, সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়ে। এটা চেনা চিত্র। কিন্তু এবার যেন জ্বরের ধরন বদলে গেছে। ডেঙ্গু কিংবা ফ্লু না হলেও শরীরে ভর করছে তীব্র ব্যথা, দুর্বলতা। অজ্ঞানও হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিওে পড়তে হচ্ছে রোগীকে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ রয়েছে, তবে উপসর্গে এসেছে নতুনত্ব। ফলে বিভ্রান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের বাসিন্দা আদিত্য রহমান দুদ্নি সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকলেও বিপত্তি ঘটে তৃতীয় দিন। হঠাৎ করেই তীব্র শরীর ব্যথা ও বমিতে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েন। পরদিন নয়াটোলা পার্কে ঘুরতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। সঙ্গে থাকা বন্ধু ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় ভর্তি হন মা ও শিশু হাসপাতালে। কিৎসকরা প্রাথমিকভাবে তার ডেঙ্গু ধারণা করলেও পরীক্ষায় তা ধরা পড়েনি।

আদিত্য বলেন, “ঋতু পরিবর্তনের সময় জ্বর খুবই স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিবছরেই জ্বর, সর্দি-কাশি হয়। কিন্তু এমন বাজে অভিজ্ঞতা এর আগে হয়নি। জ্বরের পাশাপাশি তীব্র শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা। হাসপাতালে ভর্তির আগে পার্কে মাথা ঘুরে পরে গেছি।”

বর্ষা ঋতুতে জ্বর, সর্দি-কাশি খুবই সাধারণ বিষয় বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। তবে আদিত্য রহমানের মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। যাদের ভাষ্য, এবারের জ্বর অন্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন।

পটিয়ার শাকিল আহমেদ গত ১৫ দিনে দুইবার জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রথম দফায় সাধারণ ওষুধে জ্বর সেরে গেলেও এবার শয্যাশায়ী।

শাকিল বলেন, “গত পনের দিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলাম। তখন অফিস থেকে দুই দিনের ছুটি নিয়ে বিশ্রাম করেছি এবং প্যারাসিটামল খেয়েছি। তাতেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনদিন আগে আবারও জ্বর আসে। তবে এবার তীব্র শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা কাজ করছে। একা একা হেঁটে টয়লেটে পর্যন্ত যেতে পারছি না।”

কী বলছে আইইডিসিআর

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. রত্না দাশ বলেন, “নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রামণ নিয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য নেই। এ সংক্রান্ত কোনো অ্যানালাইসিস আমাদের হয়নি। তবে নিয়মিত ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইলেন্স করা হচ্ছে।”

ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে আইইডিসিআরের দুইটি প্রতিবেদন। গত মে মাসে পরিচালিত ‘ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভেইল্যান্স’ অনুযায়ী, ইনফ্লুয়েঞ্জা সদৃশ অসুস্থতা (আইএলআই) ও মারাত্মক শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (এসএআরআই) মিলিয়ে ফ্লু পজিটিভ রোগীর হার ছিল ৭.৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে হাসপাতালভিত্তিক প্রতিবেদনে এই হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ১২ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাইরাল সংক্রমণের হার শিশু থেকে শুরু করে তরুণ, এমনকি মধ্যবয়সীদের মধ্যেও লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ১-৫ বছর ও ১৫-২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার ছিল তুলনামূলক বেশি।

হাসপাতালভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ১৫-২৪ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে ফ্লু পজিটিভের হার ছিল ১৫ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত—যা কর্মজীবী তরুণদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেটের হাসপাতালগুলোতে ফ্লু পজিটিভ হার ছিল ১১ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত।

এই সময়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি কোভিড-১৯ সংক্রমণও কম নয়। মে মাসে হাসপাতালভিত্তিক পরীক্ষায় কোভিড পজিটিভের হার ছিল গড়ে ৫.৯ শতাংশ। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে এই হার ছিল ৮ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত।

জ্বরের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত তরল আর বিশ্রাম জরুরি, সেই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইনফ্লুয়েঞ্জাও হতে পারে মৃত্যুর কারণ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “এখন একসাথে একাধিক ভাইরাল রোগ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিডের মতো রোগ। এরা নানা ধরনের লক্ষণ নিয়ে আসছে। ডেঙ্গুও তার লক্ষণ পরিবর্তন করেছে। আগে যে ধরনের লক্ষণ দেখা যেত, এখন সেই রকম হচ্ছে না। এতে শুধু রোগীরা না, চিকিৎসকরাও ঘাবড়িয়ে যাচ্ছেন। কেন না, ইনফ্লুয়েঞ্জার টেস্ট হয় না। এটি একটি ভাইরাস, কিন্তু এই ভাইরাসের টেস্ট আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবি করে। কিন্তু প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে করে না, ফলে ডায়াগনোসিস হয় না।”

তিনি আরও বলেন, “ডেঙ্গু আবার একেক সময় অনুযায়ী পজিটিভ ও নেগেটিভ হবে। এনএস১ এক থেকে তিনদিন পজিটিভ হয়। আবার তিন-চার দিন নেগেটিভ থাকবে। সাত দিন থেকে আইজিএম হবে। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটা জটিল। আবার চিকনগুনিয়া হলে তীব্র শরীর ব্যথাসহ নানা লক্ষণ থাকবে। সব মিলিয়ে মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে।”

সতর্ক করে এ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “এই লক্ষণগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জার হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আইইডিসিআর সারাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ পেয়েছে। এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারও কারও জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা মারাত্মক হতে পারে, যেমন: নিউমোনিয়া হয়ে মৃত্যু।”

মশা নিয়ন্ত্রণেই উপশম, ইনফ্লুয়েঞ্জায় টিকার পরামর্শ

ডা. বে-নজিরের মতে, “এডিস মশা যদি ভালো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলে অন্তত দুইটা রোগ নিয়ন্ত্রণে আসবে—ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া। আর ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য মানুষকে প্রতিবছর টিকা নিতে হবে। আমরা নিজেরা নিচ্ছি, অন্য মানুষদেরও বলছি। এতে বয়স্ক ও ক্রনিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিরাপদ থাকবে।”

তিনি আরও বলেন, “কোভিড হলেও এরকম কিছু লক্ষণ পাওয়া যাবে। এ বছর বেশ কিছু মৃত্যুও হয়েছে। এখানে দুইটা বিষয় রয়েছে। ব্যক্তিগত প্রতিরোধ: মাস্ক পড়া, হাত ধোয়া, মশার কামড় না খাওয়া। আর যদি কারও জ্বর হয়ে যায়, প্রথম কাজ হবে প্রচুর পানি খাওয়া। পানি খেলে লক্ষণ কিছুটা উপশম করে। পরীক্ষা করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”